রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মসিক আর-রাশাদ ফেবঃসংখ্যা ২০১৬-কাদিয়ানী আন্দোলন : সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফসল

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

মিথ্যা নবুওয়াতের দাবীদার মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী প্রবর্তিত কাদিয়ানিবাদ একটি ধর্ম বিশ্বাস, একটি স্বতন্ত্র মতবাদ। বিংশ শতাব্দীর এক ক্রান্তিকালে বৃটিশ সামাজ্যবাদ কর্তৃক সৃষ্ট এ মতবাদ ইসলামের শাশ^ত মূল্যবোধ ও লালিত ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এ আন্দোলন বিশ্বনবী রাহমাতুল লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সা.-এর শান, মান ইজ্জত ও মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ। এক কথায় মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে কাদিয়ানী মতবাদ একটি বিষাক্ত কৃপাণ, একটি বিদ্রোহ। ইহুদী-খ্রিস্ট ও ঈঙ্গ-মার্কিন অক্ষ শক্তি অর্থায়নে লালিত একটি গোষ্ঠী নিজেদের আহমদিয়া মুসলিম জামায়াত (কাদিয়ানী সম্প্রদায়) পরিচয় দিয়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফ্রিকায় প্রকাশ্যে ও সংগোপনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সা.-এর নবুওয়াতের পরিসমাপ্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে অথচ হযরত মুহাম্মদ সা. হচ্ছেন শেষ নবী ও শেষ রাসূল; তাঁর পরে আর কোন নবী ও রাসূল আসবেন না; কোন ঐশী গ্রন্থ ও آسمانی کتاب অবতীর্ণ হবে না। কারণ দীন ও ধর্মের পূর্ণতা ও বিকাশ হযরত মুহাম্মদ সা.-এর হাতে সুসম্পন্ন হয়েছে ও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। Ñআল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদা : ৩-৪
পবিত্র কুরআনের ঘোষণা ও হাদীসের বাণী এ কথারই জীবন্ত সাক্ষী। এর পরেও কেউ নবী দাবী করলে সে হবে ভ-, কাপুরুষ ও প্রতারক। পবিত্র কুরআনের বিশ্ব বিশ্রুত ভাষ্যকার ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন-
وَقَدْ أَخْبَرَ تَعَالَىٰ فِيْ كِتَابِهِ، وَرَسُوْلِهِ فِي السُّنَّةِ الْـمُتَوَاتِرَةِ عَنْهُ: أَنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدَهُ؛ لِيَعْلَمُوْا أَنَّ كُلَّ مَنِ ادَّعَىٰ هَذَا الْـمَقَام بَعْدَهُ، فَهُوَ كَذَّابٌ أَفَّاكٌ، دَجَّالٌ ضَالٌّ مُضِلٌّ.
‘মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর ধারাবাহিক হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদ সা. -এর পরে আর কোন নবী আসবে না। মানুষ যাতে জেনে যায় যে, তাঁর পরে কেউ নবুওয়তের দাবী করবে সে হবে মিথ্যাবাদী, কুৎসা রটনাকারী, দাজ্জাল, পথভ্রষ্ট ও গোমরাহী সৃষ্টিকারী।
Ñতাফসীর ইবনে কাসীর, খ. ৩, পৃ. ৪৯৪
ষড়যন্ত্রের বীজ বপন
ইতিহাস পাঠকদের অজানা নয় যে, সুচতুর ইংরেজ জাতি প্রণীত এক সুদূরপ্রসারী সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশার আওতায় কাদিয়ানী ধর্মমতের জন্ম। ইসলামের জাগরণ ও অগ্রযাত্রাকে স্তব্দ করে দেয়া এবং মুসলমানদের মধ্যে মতভেদের বীজ বপন করাই হচ্ছে এ নীলনকশার উদ্দেশ্য। বিংশ শতাব্দী মুসলমানদের জাগরণের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। শহীদে বালাকোট হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ বেরলভীর নেতৃত্বে ভারতে, শেখ মুহাম্মদ আহমদের নেতৃত্বে সুদানে এবং আল্লামা জামালুদ্দীন আফগানীর নেতৃত্বে আফগানিস্তানে যখন নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিহাদী আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠে; জনগণের মধ্যে যখন এ আন্দোলন অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে তখন এসব অঞ্চলে চেপে বসা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ‘ব্রিটিশ’ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ে। তারা ভাবলো, ইসলামী পূনর্জাগরণের এ দ্বীপশিখাকে অংকুরে নির্বাপিত করে না দিলে হয়তো কালক্রমে বিদ্রোহের এ আগুন লেলিহান শিখার রূপ ধারণ করে ভারত উপমহাদেশে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও উপনিবেশবাদের কাঠামোকে বিপন্ন করে তুলবে কারণ সাম্রাজ্যবাদীরা খ্রিস্টান হোক আর ইহুদী হোক মুসলমানদের জিহাদী চেতনা ও শাহাদতের জযবাকে তারা ভীষণ ভয় পায়।
ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ভাবপ্রবণতা, ও সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ইংরেজ জাতি আগে থেকেই ছিল সম্যক অবহিত এবং তারা ভালোভাবেই জানে যে, ধর্মীয় চেতনাবোধ হচ্ছে ভারতীয় জনগণের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। ইসলামী জাগরণকে বিধ্বস্ত করে দেয়ার লক্ষ্যে ধর্মীয় ভাবপ্রবণতাকে কাজে লাগানোকে একমাত্র মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে তারা গ্রহণ করে। এ লক্ষ্য হাসিলের জন্য ব্রিটিশরা মুসলমানদের মধ্য হতে ইংরেজদের বিশ্বস্ত, ওয়াফাদার ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে বের করার জন্য গোটা উপমহাদেশে ব্যাপক জরিপ চালায়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায় ইরানের বাহাউল্লাহ নামে পরিচিত মির্জা হোসাইন আলী আর ভারতের মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ইংরেজদের এজেন্ট হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, জিহাদী চেতনা নস্যাৎ ও গুপ্তচর বৃত্তি পরিচালনার জন্য এ দু’মির্জাকে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা অর্থ-বিত্তের বিনিময়ে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে। ইংরেজদের নীলনকশা অনুযায়ী দু’জনই আন্দোলন চালাতে থাকে। বাহাউল্লাহ দূঃসাহস দেখিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে বিষোদগার শুরু করে দেন। এমন কি তিনি ঘোষণা করেন যে, তার কিতাব দ্বারা কুরআন করীম রহিত হয়ে গেছে এবং তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ সা.-এর শরীয়ত রহিতকারী। অতিঅল্প সময়ে তার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়, জনগণ তাকে মুরতাদ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে কিন্তু মির্জা গোলাম কাদিয়ানী ছিলেন ধুরন্ধর ও অধিকতর চতুর। প্রাথমিক অবস্থান তিনি তার বিদ্বেষকে গোপন রাখেন পর্যায়ক্রমে মুজাদ্দিদ, মাহদী, প্রতিশ্রুত মসীহ ও সর্বশেষ পয়গাম্বর দাবী করে স্বরূপে আবির্ভূত হন এবং বাতিল আকিদার প্রচারকাজে নিজকে নিয়োজিত রাখেন। এভাবে মুসলমানদের সারিতে অবস্থান করে সাম্রাজ্যবাদীদের খিদমত আঞ্জাম দিতে থাকে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ হযরত আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী এ প্রসঙ্গে বলেন,
‘মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনাকে বিধ্বস্ত করে দেয়ার জন্য অন্যান্য কৌশলের চেয়ে ব্রিটিশদের এ মন্ত্র ছিল অধিকতর কার্যকর। ব্রিটিশ সরকার তাদের এ পরিকল্পনা বাস্তাবায়নের লক্ষ্যে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে বাছাই করে নিল বিশ্বস্ত বরকন্দাজরূপে। মানসিক অস্থিরতা, হতাশার শিকার, উচ্চাভিলাষী এ ব্যক্তি এবং তার অনুসারীরা একটি নূতন ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর মতো ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য ব্রিটিশদের এ প্রস্তাব সাগ্রহে লুফে নেয়। এলক্ষ্য অর্জনের জন্য মুসলমানদের মধ্যে তিনি ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি যোগ্যতম বলে বিবেচিত হয়নি’ Ñআল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলা নদভী, কাদিয়ানিবাদ, অনুবাদ: আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন, ঢাকা, ১৯৯৪, পৃ. ১৫
সেবাদাসবৃত্তির যাত্রা শুরু
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সেবাদাসবৃত্তির কাজ শুরু করেন প্রকাশ্যে ও সংগোপনে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যায়ক্রমে তিনি তার অভিযান পরিচালনা করেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি সংস্কারক। (মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, বারাহীন ই আহমদীয়া, ১ম খ-ের সম্পূরক, ১৮৮৪ সংস্করণ, পৃ. ৮২) হিসেবে নিজকে উপস্থাপন করেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে ইমাম মাহদী (প্রাগুক্ত, ৩য় খ-, পৃ. ২২৪-২৩১), তৃতীয় পর্যায়ে প্রতিশ্রুত মসীহ (মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, ফাতহ ই ইসলাম, ১৮৯১, পৃ. ৬-৭) এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নবী দাবি করে বসেন। Ñমীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, তোহফাতুন নবুওয়ত, যিয়ারুল ইসলাম প্রেস, কাদিয়ান, পাঞ্জাব, পৃ. ৪
এভাবে মির্জা গোলাম আহমদ আহমদ কাদিয়ানী খ্রিস্টানদের বিশ্বস্ত সেবক ও বৃত্তিভোগী এজেন্ট হিসেবে ইসলাম বিরোধী এ আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর স্বলিখিত বক্তব্য এ কথায় জীবন্ত সাক্ষী:
میری عمر کی اکثر حصہ اس سلطنت انگریزی کی تائید وحمایت میں گذرا ہے اور میں نے ممانعت جہاد اور انگریزی اطاعت کے بارے اس قدر کتابیں لکھی ہیں کہ اگر وہ اکٹھی کی جائیں تو پچاس الماریاں ان سے بھر سکتی ہیں۔ میں نے ایسی کتابوں کو تمام ممالک عرب؛ مصر اور شام، کابل اور روم تک پہنچا دیا ہے۔
‘আমার জীবনের বৃহত্তর অংশ ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা ও সমর্থনে ব্যয়িত হয়েছে। বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার জন্য এবং তাদের আনুগত্য করার জন্য আমি এত বেশি গ্রন্থ লিখেছি যে, এগুলো একত্র করা হলে পঞ্চাশটি আলমারী ভর্তি হয়ে যাবে। এ সব গ্রন্থ সমূহ আমি আরব, মিসর, সিরিয়া, কাবুল ও রোমে বিতরণ করেছি’। Ñমির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, তিরইয়াতুল কুলুব, যিয়ারুল ইসলাম প্রেস, কাদিয়ান, পাঞ্জাব, পৃ. ১৫
আরেক জায়গায় মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী লিখেন,
میں ابتدائی عمر سے اس وقت تک جو تقریبًاساٹھ برس کی عمر تک پہنچاہوں، اپنی زبان اور قلم سے اہم کام میں مشغول ہوں، تاکہ مسلمانوں کے دلوں کو گورنمٹ انگلشیہ کی سچی محبت اور خیر خواہی اور ہمدردی کی طرف پھیراوں اور انکے بعس کم فہیموں کے دلوں سے غلط خیال جہاد وغیرہ کے دور کروں جو دلی صفائی اور مخلصانہ تعلقات سے روکتے ہیں اور میر دیکھتا ہوں کہ مسلمانوں کے دلوں پر میری تحریروں کا بہت ہی اثر ہوا اور لاکھوں انسانوں میں تبدیلی پیدا ہو گئی۔
‘জীবনের প্রারম্ভ কাল থেকে আজ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত আমার কলম ও রসনাকে আমি নিয়োজিত রেখেছি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে, সেটা হচ্ছে বৃটিশ সরকারের প্রতি সহানুভূতি, শুভেচ্ছা এবং সত্যিকারের ভালোবাসা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের অন্তরে পরিবর্তন সৃষ্টি করা; এবং তাদের মধ্যে কম মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের হৃদয় থেকে জিহাদের চেতনাকে নিশ্চিহ্ন করা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, আমার লেখা মুসলমানদের অন্তরে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এবং লাখো মানুষের অন্তরে পরিবর্তন এসেছে।’ Ñমীর কাসেম আলী কাদিয়ানী, তাবলীগে-ই-রিসালাত,৭ম খ-, পৃ. ১০
মির্জা সাহেব এবং ইংরেজ সরকারের কাছে লিখিত সেবাদাসবৃত্তির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে,
میں نے بیسوں (پچاس ہزار کے قریب) کتابیں عربی، فارسی اور اردو میں اس غرض سے تالیف کی ہیں کہ اس گورنمٹ محسنہ سے ہرگز جہاد درست نہیں، بلکہ سچے دل سے اطاعت کرنا پر ایک مسلمان کا فرض ہے، چنانچہ میں نے یہ کتابیں بصرف زر کثیر چھاپ کر بلاد اسلامیہ میں پہونچائیں اور میں جانتاہوں کہ ان کتابوں کا بہت سا اثر اس ملک میں بھی ایسے اور جو لوگ میرے ساتھ مرید کا تعلق رکھتے ہیں، وہ ایک ایسی جماعت تیار ہوتی جاتی ہے کہ جن کے دل اس گورنمنٹ کی سچی خیر خواہی سے لباب ہیں، انکی اخلاقی حالت اعلیٰ درجہ پر ہے، اور میں خیال کرتا ہوں کہ وہ تمام اس ملک کیلئے بڑی برکت ہیں اور گورنمنٹ کیلئے دلی جاں نثار۔
‘আরবী, ফার্সী ও উর্দুতে আমি প্রচুর (প্রায় ৫০ হাজার) বই লিখেছি এ উদ্দেশ্যে যে, সদাশয় (ব্রিটিশ) সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করা কোন ক্রমেই যুক্তি সঙ্গত নয়; বরং সর্বান্তকরনে তাদের আনুগত্য করা মুসলমানদের জন্য ফরয। বহু অর্থ ব্যয় করে এ সব পুস্তকসমূহ আমি ছেপেছি এবং মুসলিম দেশসমূহে বিতরণ করেছি। আমি যতদূর জানি এ সব পুস্তক ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এমনকি এদেশেও যে সব মানুষ আমার প্রতি আধ্যাত্মিক ভাবে অনুগত তাঁদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে একটি দলে পরিণত হচ্ছে; তাঁদের অন্তর (ব্রিটিশ) সরকারের অনুপম আন্তরিকতার আলোকে উদ্ভাসিত; যাদের নৈতিক মান অত্যন্ত চমৎকার। আমি মনে করি তাঁরা দেশের জন্য বরকত স্বরূপ হবেন এবং সরকারের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবেন। Ñমীর কাসেম আলী কাদিয়ানী, তাবলীগে-ই-রিসালাত, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ৬৫ (মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর পক্ষ হতে মহিমান্বিত ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আবেদন)
সরকারের অভ্যন্তরে কাদিয়ানী
ইংরেজ সাম্রাজ্যেবাদের সহযোগিতায় মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী একদল যোগ্যও নিবেদিত প্রাণ এজেন্ট গড়ে তোলেন যারা বিভিন্ন দেশে বৃটিশ সরকারের পক্ষে গোয়েন্দা বৃত্তিতে নিয়োজিত ছিল। এসব এজেন্টদের কাজ হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, জিহাদী চেতনা অবদমন ও গোয়েন্দগিরি করা। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এদের লালন-পালন করে। যেহেতু এরা ইংরেজদের এজেন্ট তাই জার্মান সরকার তার মন্ত্রীবর্গকে কাদিয়ানীদের মাহফিল অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
Ñআল ফজল, কাদিয়ান, ১ নভেম্বর, ১৯৩৪ খৃ.
১৯২৩ সালে এক কাদিয়ানী ধর্মপ্রচারক ব্রিটিশের পক্ষে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে রাশিয়ায় ধৃত হয়। Ñমুহাম্মদ আমিন, আল ফজলুল কাদিয়ানী, ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২৩ খৃ.
কাদিয়ানী ধর্মমতের মূল মদদদাতা ও নেপথ্য নায়ক যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কাদিয়ানীদের মুখপত্র ‘আল-ফজল’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার পরিচয় পাওয়া যায়।
‘ব্রিটিশ সরকার আমাদের জন্য ঢাল স্বরূপ। যার ছত্রছায়ায় আমরা কেবল সম্মুখের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। যদি এ ঢাল সরিয়ে নেয়া হয়, তাহলে আমরা শত্রুর আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবো। সুতরাং আমরা এ জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছি যে, বৃটিশের উন্নতির অর্থ আমাদের উন্নতি এবং তাদের ধ্বংসের অর্থ আমাদের ধ্বংস। Ñআল ফজল, ১৯ অক্টোবর, ১৯১৫ খৃ.
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ আন্দোলনে কাদিয়ানীদের কোন অবদান না থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বিভাগের উচ্চাসনে কাদিয়ানীদের অবস্থান ছিল সুদৃঢ়, বলতে গেলে আগের তুলনায় এখন আরো সুসংহত। কাদিয়ানী মতবাদের বিশ্বাসী স্যার জাফরুল্লাহ খান ছিলেন পাকিস্তানের ক্ষমতাধর পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাকিস্তানের ওয়াকফ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর দীনি প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, মক্তব ও মসজিদকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে এ থেকে উপার্জিত অর্থসমূহে ভাগ বসিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কাদিয়ানীদের ব্যস্থাপনায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয়নি। এ অব্যাহতি প্রমাণ করে কাদিয়ানীরা পাকিস্তান সরকারের অভ্যন্তরে কত শক্তিশালী। কাদিয়ানীদের কেন্দ্র রাবওয়া থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সংবাদ সাময়িকীতে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে বলা হয় আবেদনপত্র যেন সরাসরি কাদিয়ানীদের হেড কোয়ার্টারের নির্ধারিত সেলে পাঠানো হয়। সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে কাদিয়ানী অফিসার থাকায় কাদিয়ানী কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ তাদের জন্য সহজতর হয়। এভাবে তারা সরকারের অভ্যন্তরে আরেক সরকার কায়েম করে। Ñআল্লামা শহীদ ইহসান ইলাহী জহীর, মীর্জাইয়ত আওর ইসলাম, লাহোর, ১৯৯৩, পৃ. ১২২-৩
‘বাংলাদেশের প্রশাসনের উচ্চ স্তরে কাদিয়ানী এজেন্টরা অত্যন্ত সক্রিয়। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার যে কোন দাবিকে এসব এজেন্টরা সংগোপনে সরকারের অভ্যন্তরে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। কাদিয়ানীরা বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমানগণকে কাদিয়ানী বানানোর চেয়ে উচ্চ শিক্ষিত ও পেশাজীবীদের ধর্মান্তরিত করার জন্য সচেষ্ট। তারা টার্গেট নিয়ে এতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ের অনেক লোককে কাদিয়ানী বানাতে সক্ষম হয়েছে। এদের মধ্যে ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, রাষ্ট্রদূত, অধ্যাপক ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে বছর কয়েক আগে কাদিয়ানীরা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে এক লাখ মার্কিন ডলার চাঁদা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক মাঝেমধ্যে বিবৃতি দিয়ে কাদিয়ানীদের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে থাকেন। এদেশের কাদিয়ানীরা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন দিয়ে থাকেন যাতে বিপদের সময় তাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নেয়া যায়।
আবদুল লতীফ কাদিয়ানী, মোল্লা আবদুল হালিম কাদিয়ানী ও মোল্লা নূর আলী কাদিয়ানী ১৯২৫ সালে আফগান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পরিচলানা করেন ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা হিসেবে। তৎকালীন আফগান সরকার গোয়েন্দাবৃত্তি ও খতমে নবুওয়ত বিরোধী আন্দোলন পরিচালনার অভিযোগে এ তিন জনকে ফাঁসি দেন। Ñদৈনিক আল ফজল, ৩ মার্চ সংখ্যা, ১৯২৫
কারণ আফগান জাতি ঐতিহ্যগতভাবে মুজাহিদ ও সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত। দালালীকে তারা প্রশ্রয় দিতে নারাজ; খতমে নবুওয়াত আকীদার সাথে তারা আপোষ করার পক্ষপাতী নন। কারণ মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও তার অনুসারীরা প্রকাশ্য ঘোষণার করেছে কাদিয়ানী ধর্ম যারা গ্রহণ করবে না তারা কাফির। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর পুত্র মির্জা বশির উদ্দীন মাহমুদ যিনি কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় খলীফা হিসেবে স্বীকৃত, আইন-ই-সাদাকত গ্রন্থে বলেন, ‘যেসব মুসলমান প্রতিশ্রুত মসিহের আনুগত্যের শপথ নিয়ে অঙ্গীভূত হবে না; তারা তার নাম শ্রবণ করুক বা না করুক কাফির এবং ইসলাম থেকে খারিজ। Ñমীর্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ, আইনা-ই-সাদাকাত, পৃ.৩৫
সেহেতু আমরা মির্জা গোলাম আহমদকে নবী মানি এবং অ-আহমদিয়া তাকে নবী মনে করে না এবং কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী কোন নবীকে অস্বীকার কররে মুরতাদ (স্বধর্ম ত্যাগী) হয়ে যায় সেহেতু অ-আহমদিয়াগণ কাফির।
Ñ দৈনিক আল ফজল, কাদিয়ান, ২৬ ও ২৯ জুন, ১৯২২
মুসলমান ও কাদিয়ানীদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে মির্জা বশির উদ্দীন মাহমুদ তাঁর পিতা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,
ان کا (مسلمانوں کا) اسلام اور ہے اور ہمارے یہ غلط ہے کہ دوسرے لوگوں سے ہمارا اختلاف صرف وفات مسیح یا اور چند مسائل میں ہے۔ اللہ تعالیٰ کی ذات، رسول کریم ﷺ، قرآن، نماز، روزہ، حج، زکاۃ غرض آپ نے تفصیل سے بتایا کہ ایک ایک چیز میں ان سے اختلاف ہے۔
‘এটা ভুল যে আমাদের সাথে তাদের (মুসলমানদের) মতদ্বৈততা সুধু মসীহ এর মৃত্যু অথবা কতিপয় মাসআলাকে কেন্দ্র করে নয় বরং আল্লাহ, হযরত মুহাম্মদ সা., কুরআন, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতের ব্যাপারে আমরা তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করি। মোট কথা প্রতিটি ব্যাপারে আমাদের সাথে তাদের মতবিরোধ রয়েছে। Ñপ্রাগুক্ত, ৩০ জুন, ১৯৩১
মির্জা গোলাম কাদিয়ানীর দ্বিতীয় ছেলে মির্জা বশির আহমদ বলেন,
ہر ایک ایسا شخص جو موسیٰ ؑ کو تو مانتا ہے مگر عیسیٰ ؑ کو نہیں مانتا یا عیسیٰ ؑ کو مانتا ہے مگر محمدﷺ کو نہیں مانتا، یا محمد ﷺ کو مانتا ہے مگر مسیح موعود (غلام قادیانی) کو نہیں مانتا، وہ صرف کافر بلکہ پکا کافر اور دائرہ اسلام سے خارج ہے۔
‘যে ব্যক্তি হযরত মূসা আ.-কে মানে কিন্তু হযরত ঈসা আ.-কে মানে না, হযরত ঈসা আ.-কে মানে অথচ হযরত মুহাম্মদ সা.-কে মানে না, হযরত মুহাম্মদ সা.-কে মানে অথচ প্রতিশ্রুত মসীহ (গোলাম কাদিয়ানী)-কে মানে না, সে শুধু কাফির নয় বরং পাক্কা কাফির এবং ইসলামের গন্ডি থেকে খারিজ। Ñমীর্জা বশীর আহমদ, কালিমায়ে আল ফজল, জবাবধষফ জবষরমরড়হ
আফ্রিকা ও ইউরোপ কাদিয়ানী মতবাদের উর্বর ক্ষেত্র
ভারতের গুরুদাসপূর জেলার কাদিয়ান নামক এলাকায় কাদিয়ানী মতবাদের জন্ম হলেও সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের ৭০ বছরের সার্বিক সহায়তা সত্ত্বে¡ও কাদিয়ানীরা তাদের ধর্মমতের প্রচার নির্বিঘেœ এশিয়ায় কোন দেশে চালাতে পারেনি। প্রবল বাধা ও জনরোষের সম্মুখীন হয়ে সংগোপনে প্রচার কাজ চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি বসায়। এশিয়ায় বিভিন্ন দেশে বিশেষত ভারত, বাংলাশে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক ও আরব দুনিয়ার মুসলমানরা কাদিয়ানীদের কাফির হিসেবে জানে এবং কাদিয়ানীদের অপতৎপরতা প্রতিরোধকল্পে তাদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে এসব দেশের মুসলমানগণ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কাদিয়ানীরা এশিয়াকে তাদের জন্য নিরাপদ স্থান মনে না করে আফ্রিকা ও ইউরোপকে উর্বর স্থান হিসেবে বেচে নিয়েছে। কারণ এসব দেশে সচেতন মুসলমান ও প্রতিবাদী আলিম উলামার সংখ্যা স্বল্প। এ সুযোগে কাদিয়নীগণ ইহুদী-খ্রিস্ট সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ পৃষ্টপোষকতায় খাঁটি মুসলমানদের ধোকা দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাদেরকে কাদিয়ানী বানানোর এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কাদিয়ানীদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেয়ার জন্য আফ্রিকায় মুসলমানদের হাতে একটি সংবাদ পত্রও নেই অথচ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থায়নে কাদিয়ানীরা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে উন্নতমানের পাঁচটি ম্যাগাজিন বের করছে। কাদিয়ানী মুবাল্লিগগণ আফ্রিকা মহাদেশের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাদের ধর্মপ্রচারের জন্য নিয়মিত সফর করে থাকে। ইতোমধ্যে আফ্রিকায় কাদিয়ানীরা ৪৭টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাদের মসজিদ নির্মাণ করেছে ২৬০টি। Ñআল্লামা শহীদ ইহসান ইলাহী জহীর, কাদিয়ানী মতবাদ, রিয়াদ, ১৯৯৬, পৃ. ২৮-২৯
প্রতিটি মসজিদের সাথে রয়েছে অত্যাধুনিক গ্রন্থ সমৃদ্ধ লাইব্রেরী। তারা বিভিন্ন দেশে অনেকগুলো হাসপাতাল ও সমাজ সেবা কেন্দ্র খুলেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিগত ১৫ বছরের আন্দোলনের ফলে আফ্রিকায় কাদিয়ানী অনুসারীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখে। Ñপ্রাগুক্ত)
এ ব্যাপারে দুনিয়ার মুসলমানদের উদাসীনতা ও নিরবতা শুধু বেদনাদায়ক নয়, রীতিমত লজ্জাজনক বটে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের লীলাভূমি ইংল্যান্ড হচ্ছে কাদিয়ানীদের অপর এক তীর্থ স্থান। ইউরোপের সব কর্মকা- লন্ডন থেকে পরিচালিত ও মনিটর করা হয়। মির্জা তাহের কাদিয়ানী লন্ডনে বসে কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে খুতবা প্রদান করেন এবং প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন।
ড. মুহাম্মদ ইকবালের সাহসী ভূমিকা
উপমহাদেশের অনেক আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তি কাদিয়ানী মতবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে অনবহিত। তারা মনে করেন, হানাফী, শাফেয়ী অথবা দেওবন্দী-বেরলভী মতাদর্শের মতো কাদিয়ানীবাদ ও একটি মুসলিম আকিদা বিশ্বাসের (ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ) নাম। ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত দার্শনিক, প-িত ও কবি আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল অতি নিকট থেকে কাদিয়ানী মতবাদকে পর্যবেক্ষণ করে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, কাদিয়ানীবাদ একটি স্বতন্ত্র ধর্ম, ইসলামের মর্মমুলে আঘাত হানার জন্য এ ধর্মমতের সৃষ্টি। ভারতের ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকা কাদিয়ানী সমস্যা নিয়ে একদা প্রশ্ন তুললে ড. ইকবাল তার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কাদিয়ানীবাদ হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নবুওয়াতের সান্তরাল আরেকটি নবুওয়াত এবং একটি নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিত্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এক সংবদ্ধ ষড়যন্ত্র (ঞযব ঝঃধঃবংসধহ, ১০ঃয ঔঁহব, ১৯৩৫)। মি. জওয়াহের লাল নেহেরু একদিন প্রশ্ন করেছিলেন কেন মুসলমানগণ কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার জন্য এত বেশি তৎপর যদিও তারা ইসলামের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো একটি সম্প্রদায়। ড. ইকবাল উত্তরে বলেন, মুসলমানগণ এজন্য বেশি তৎপর যে, কাদিয়ানী আন্দোলন পয়গাম্বরে খোদা হযরত মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতকে একজন ভারতীয় পয়গাম্বরের উম্মত করার প্রয়াসে লিপ্ত। স্পিনোজা (ঝঢ়রহড়ুধ) এর ধর্মীয় মতবাদ ইহুদীবাদের জন্য যত মারাত্মক তার চেয়ে অধিকতর ক্ষতিকর ভারতে ইসলামের সম্মিলিত অস্তিত্বের জন্য। ড. ইকবালের এ সাহসী ভূমিকার ফলে অনেক আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তি কাদিয়ানী মতবাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন করেন। এ মহান কবি গভীর মনীষা, পা-িত্য, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন, কাদিয়ানীরা মুসলমান নয়। ভারতের দৈনিক স্টেটসম্যান (ঞযব ঝঃধঃবংসধহ) পত্রিকার সম্পাদকের কাছে কাদিয়ানী ফিৎনা খতমে নবুওয়ত সম্পর্কে যে ঐতিহাসিক চিঠি লিখেন তার প্রতিটি অক্ষর স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো:
‘ওংষধস রং বংংবহঃরধষষু ধ ৎবষরমরড়ঁং ড়ৎফবৎ যিরপয যধং ফবভরহবফ ষরসরঃং, ঃযধঃ রং, নবষরবভ রহ ঃযব টহরঃু ধহফ ঙস-হরঢ়ড়ঃবহপব ড়ভ এড়ফ, ভধরঃয রহ ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়যবঃং ধহফ ঃবৎসরহধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়যবঃযড়ড়ফ ড়হ ঃযব ধফাবহঃ ড়ভ ঐরং ষধংঃ গবংংবহমবৎ, গঁযধসসধফ (ঢ়বধপব নব ঁঢ়ড়হ যরস). ঋধরঃয রহ ঃযব ষধংঃ সবহঃরড়হবফ পৎববফ রফ, রহ ৎবধষরঃু, ঃযব ফরংঃরহমঁরংযরহম ভবধঃঁৎব নবঃরিরহ ধ গঁংষরস ধহফ ধ হড়হ-গঁংষরস ধহফ ধ ফবঃবৎসরহধহঃ যিবঃযবৎ ধ পবৎঃযরহ রহফরারফঁধষ ড়ৎ মৎড়ঁঢ় ভড়ৎসং ঢ়ধৎঃ ড়ভ ঃযব গংঁষরস পড়সসঁহরঃু ড়ৎ হড়ঃ. ঞধশব, ভড়ৎ বীধসঢ়ষব, নৎধযসড় ঝধসধল যিরপয যধং ভধরঃয রহ এড়ফ ধহফ ধপশহড়ষিবফমবং গঁযধসসধফ ধং ধ চৎড়ঢ়যবঃ ড়ভ এড়ফ, নঁঃ রঃং াড়ঃধৎরবং পধহহড়ঃ নব ঃৎবধঃবফ ধং গঁংষরসং, ভড়ৎ, ষরশব ঃযব ছধফরধহরং, ঃযবু নবষরবাব রহ ঃযব পড়হঃরহঁধহাব ড়ভ ৎবাবষধঃরড়হ ধহফ ফড় হড়ঃ ৎবমধৎফ ঃযব চৎড়ঢ়যবঃ ড়ভ রংষধস ধং ঃযব খধংঃ চৎড়ঢ়যবঃ. অং ভধৎ ধং র ধস ধধিৎব, ড়হ ংবপঃ ড়ভ রংষধস যধং বাবৎ ঃৎরবফ ঃড় মড় নবুড়হফ ঃযরং ষরহব ড়ভ ফবসধৎপধঃরড়হ. রহ ষৎধহ, ঃযব নধযধরঃবং ফবহরবফ ঃযরং বংংবহঃরধষ পৎববফ নঁঃ ঃযবু ধষংড় পড়হভবংংবফ ঃযধঃ ঃযবু পড়হংঃরঃঁঃবফ ধফরংঃরহপঃ ৎবষরমরড়ঁং ড়ৎফবৎ ধহফ বিৎব হড়ঃ ধ ংবপঃ ড়ভ ঃযব গঁংষরসং. ডব নবষরবাব ঃযধঃ রংষধস, ধং ধ ৎবষরমরড়হ, যধহ নববহ ৎবাবধষবফ নু এড়ফ; নঁঃ, রংষধস ধং ধ ংড়পরধষ ড়ৎফবৎ ড়বিং রঃং বীরংঃবহপব ঃড় ঃযব ঢ়বৎংড়হ ড়ভ ঃযব ইষবংংবফ চৎড়ঢ়যবঃ. ঞযব ছধফরধহরং যধাব, রহ সু ড়ঢ়রহরড়হ, ড়হষু ঃড়ি ধিুং ড়ঢ়বহ ঃড় ঃযবস. ঞযবু ংযড়ঁষফ বরঃযবৎ ভড়ষষড়ি ঃযব ইধযধরঃবং ড়ৎ ধপপবঢ়ঃ ঃযব পৎববফ রহ ৎবমধৎফ ঃড় ভরহধষরঃু ড়ভ গঁযধসসধফ’ং ঢ়ৎড়ঢ়যবঃযড়ড়ফ রহ ঃড়ঃড়, রিঃয রঃং ভঁষষ রসঢ়ষরপধঃরড়হং, ধহফ মরাব ঁঢ়ঃযড়ংব ভধৎ-ভবঃপযবফ রহঃবৎঢ়ৎব-ঃধঃরড়হং যিরপয ধৎব ফবংরমহবফ ঃড় ষবঃ ঃযবস ৎবসধরহ রিঃযরহ ঃযব ভড়ভফ ড়ভ রংষধস রিঃয ধ ারবি ঃড় বহলড়ুরহম ঢ়ড়ষরঃরপধষ নবহবভরঃং.’
‘হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. যে সর্বশেষ পয়গাম্বর এ বিশ্বাসই হচ্ছে একক উপাদান যা ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে স্থায়ী সীমা রেখা চিহ্নিত করে দিয়েছে। এসব ধর্মবলম্বীরা আল্লাহর একত্ববাদ ও হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে কিন্তু তিনি যে সর্বশেষ পয়গাম্বর এবং ওহীর আগমন যে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে এ সত্য তারা গ্রহণ করতে নারাজ যেমন ভারতে ব্রক্ষ্ম সমাজ। এটাই একমাত্র মাপকাঠি যাদ্বারা সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কোন গ্রুপ ইসলামের অনুসারী আর কোন গ্রুপ নয়। আমার জানা মতে ইসলামে এমন কোন ফেরকা নেই যারা এ সীমান্ত রেখা অতিক্রম করার জন্য লাফ দেয়ার প্রয়াস চালাতে পারে। ইরানের ‘বাহাই’ ফেরকা রাসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতের পূর্ণতায় বিশ্বাসী কিন্তু তারা নিজেদেরকে একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে এবং সাধারণ রীতি পদ্ধতি অনুযায়ী তারা মুসলমান নয়।’
‘আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি যে, ইসলাম একটি ঐশী ধর্ম কিন্তু একটি সমাজ তথা উম্মত হিসেবে এর অস্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ সা.-এর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে আবির্তত। সুতরাং কাদিয়ানীদের কাছে দু’টো পথ খোলাÑ হয়তো তারা বাহাইদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে মুসলিম মিল্লাত থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিবে অথবা খতমে নবুওয়াতের আকিদার বিকৃত ব্যাখ্যা-ভাষ্য থেকে বিরত থাকবে। অন্যথায় তাদের ভাষ্য স্পষ্টত প্রমাণ করবে যে, তারা মুসলমান পরিচয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে সংযুক্ত থাকতে চায় কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে। এছাড়া সুযোগ সুবিধা লাভ করার ভিন্ন কোন পথ নেই। Ñড. মুহাম্মদ ইকবাল, হরফে আখির, পৃ. ১৩৬-১৩৭
শেষ কথা
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা একথা বুঝতে পেরেছি যে, কাদিয়ানী আন্দোলন মূলত সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গর্ভে লালিত, পালিত ও বর্ধিত হয়েছে ইংরেজদের অর্থায়নে। কাদিয়ানী মতবাদ হযরত মুহাম্মদ সা.-এর খতমে নবুওয়াতের প্রতি একটি প্রতারণা। এ মতাদর্শ মুসলিম উম্মাহর ঈমানী চেতনা ও শাশ^ত মূল্যবোধের প্রতি এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। এক কথায় আমাদের ইতিহাসে যত ইসলাম বিরোধী আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, কাদিয়ানী মতবাদ হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম তাৎপর্যবহুল ফিৎনা। কারণ অন্যান্য আন্দোলন সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত আর কাদিয়ানী মতবাদ হচ্ছে এমন এক চক্রান্ত যা হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নবুওয়াতের বিরুদ্ধে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ।
কাদিয়ানীদের মতাদর্শ ঈমানের জন্য বিপজ্জনক মনে করে উপমহাদেশের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বক্তৃতা, লেখনী ও জ্ঞানের অস্ত্র নিয়ে কাদিয়ানীদের মোকাবেলায় জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েন। এদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন বাটালভী রহ., মাওলানা মুহাম্মদ আলী মোঙ্গেরী বাটালভী রহ., মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী রহ. , আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ., মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বোখারী রহ., মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ., মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী রহ., খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ রহ. , মাওলানা আতহার রহ., মুফতী মাহমুদ আহমদ রহ., আল্লামা ইউসুফ বান্নরী রহ., আল্লামা সাইয়েদ আবু হাসান আলী নদভী রহ., ফখরে বাংলা আল্লাহ তাজুল ইসলাম রহ., আল্লামা মুহাম্মদ ইউনুস রহ. বি. বাড়িয়া শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার মতো। কাদিয়ানী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আল্লামা শায়খ ইহসান ইলাহী শহীদ দুনিয়ার মুসলমানদেরকে কাদিয়ানী ফিৎনার মোকাবেলায় এগিয়ে আসার জন্য যে দরদভরা আহ্বান জানিয়েছেন আমরা হুবহু তা উদ্ধৃত করছি,
‘অতএব হে মুসলমানগণ! জাগ্রত হও এবং সাবধান হয়ে যাও। এর চেয়ে দুঃখের ও অশ্রু বিসর্জনের ব্যাপার আর কি হতে পারে যে, মুসলিম বিশ্বের বহু জনপদ এ কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ মুসলমানগণ অতীতে নিজ নিজ দেশে প্রতিটি শত্রুর মোকাবেলায় জাগ্রত এবং প্রতিটি গোমরাহি ও ফ্যাসাদের বিরুদ্ধে ফয়সালা করার জন্য যুদ্ধরত ছিল। এ দায়িত্বটি প্রত্যেকের উপর তার সামর্থ অনুযায়ী প্রযোজ্য এবং কাদিয়ানীদের মোকাবেলায় তাদের বিপদ ঠেকাবার জন্য কাজ করা এমন একটি বিষয় যা ধর্মীয় রাজনৈতিক এবং দেশাত্মবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে সকলের পক্ষে অত্যন্ত জরুরী ও অপরিহার্য। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ জন্য যে, কাদিয়ানী তৎপরতা দ্বীনের আকিদা সমূহকে বিকৃত করছে এবং ইসলামের বুনিয়াদকে ধ্বংস করছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এজন্য যে, সাম্রাজ্যবাদীরা যখনই এ দলটিকে তৈরি করেছে এবং তাদের সহযোগিতার চুক্তিতে আবদ্ধ করেছে, তখন থেকেই তারা বিজিত দেশসমূহে আধিপত্য বিস্তারের জন্য এদেরকে সেতুরূপে ব্যবহার করে চলেছে। দেশাত্মবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে কাদিয়ানীদের অস্তিত্ব যে কতটুকু মারাত্মক তা অখ- ভারতের বিখ্যাত লেখক এবং ইসলামের কবি ড. মুহাম্মদ ইকবাল স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন, যখন তিনি জওহার লাল নেহেরু কর্তৃক এ দলকে সমর্থন দানের সময় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। Ñআল্লামা শহীদ ইহসান ইলাহী জহীর, কাদিয়ানী মতবাদ, রিয়াদ, ১৯৯৬, পৃ. ৩০-৩১
লেখক : বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ, চট্টগ্রাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন