রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

যে চোখের জলে নদী বয়ে চলে –মাওলানা মিযানুর রহমান জামীল

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে পথের দুরত্ব অনেক। পৃথিবীও জানে এ গন্তব্য দীর্ঘ। জীবনের টান আর প্রতিদিনের গাফলত এ মনযিলের কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। কারণ এ যে এক ভয়ংকর প্রবেশদার। যে সমাধির উল্টো পীঠে রয়েছে লাগামহীন দুনিয়ার উDVRANTOন্ত দৃশ্যপট। যার চারদিকে পাষাণ হৃদয়ের হাতছানী।


এ কঠিন দৃশ্যে পৃথিবী পরিণত হয়েছে জগদ্দল পাথরে। বিশ্বাসের ময়না পাখি মানুষের হৃদয় থেকে উড়াল দিয়ে হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। অকাট্য সত্য হয়েছে লক্ষ্যচ্চুত। বিলীন হয়েছে রাজ্য ও রাজ্যের সীমানা। মুছে গেছে জনপদ ও জনতার আওয়াজ। ভেঙ্গে গেছে আশ্বাসের ভীত ও দেয়াল। হকের প্রাসাদের উপর ধ্বসে পড়েছে বাতিলের পাহাড়। এভাবেই পৃথিবী জামানাকে কোলে নিয়ে পার করেছে দীর্ঘ এক জীবনমাত্রা। জীবনের এ অসহায় মুহূর্তে জানতে ইচ্ছে করে নিঝুম রাতের সেই আমতলার একাকী বাসিন্দারা কেমন আছে! কী ফায়সালা হয়েছে তাদের! সেখানে আছে কি খুব কাছের মানুষগুলোর কোনো নিদর্শন! বহুদিন আমাদের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই।
এখানে শিলালিপিতে পড়েছে প্রকৃতির আবরণ। প্রাচীন দেয়ালে ধরেছে ফাটল। উদ্ভিত খেয়ে ফেলেছে গোলাপজলের বোতল। বৃষ্টির ফোটা মুছে দিয়েছে কবরের শেষ চিহ্ন। উঁচু মাটির ক্ষুদ্র নিশানা হয়েছে ম্লান। তৃণলতায় মুছে গেছে আমাদের দেয়া নিদর্শন। বাঁশগুলো মাটি হয়েছে অনেক আগেই। এখানে এখন ঘনবন। অলস দুপুরে হঠাৎ দু’একটি ঘুঘু ডেকে উঠলেও রাতের পরিবেশ থাকে নির্জন। বেদনাময়ী সেই ডাহুকও রাতের নিরবতা থেকে হারিয়ে গেছে। আজকের আমতলায় সবকিছু নিসঙ্গ। যেন কেউ আবৃত্তি করছে-
নিশ্চিহ্ন হাঁড়-কাফনে হাজার বছর ধরে/ যেন আজো কাঁদছে কেউ মাটির ঐ কবরে?
দুনিয়ার চিরায়ত নিয়ম, যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অনিবার্য। পবিত্র কুরআনের বর্ণনাÑ ‘প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। বিজ্ঞানের ভাষায়- সৃষ্টির লয় অবধারিত অর্থাৎÑ প্রত্যেক বিবর্তনশীল বস্তুর ধ্বংস অনিবার্য। পৃথিবীতে কিছুই থাকবে না। যখন মানুষের শেষ সময় ঘনিয়ে আসে তখন মৃত্যু হয়ে ওঠে বড় শত্রু! জীবনের সংক্ষিপ্ত এ অধ্যায়ে সৃষ্টিকুল মৃত্যুর কাছে বড় অসহায়।
নব্বই দশককে পেছনে ফেলে যখন আমি সামনে এগিয়ে যাই তখন আমার অতীত জীবনের কিছু শূন্যতা পেছন থেকে ডাকে। না চাইতে জীবন ঘড়ি কিছুটা সময়ের জন্য উল্টো দিকে ফিরে যায়। আর আমি হারিয়ে যাই আমার গত হওয়া সেই দুরন্ত শৈশবে। ফিরে তাকাই আমার ছোট্ট জীবনের কোনো এক অজানা দিগন্তে। সেখানে বাবাকে আমি খুব কাছে পাই। স্মৃতির পাতা হাতড়ালে বাবার আদর-স্নেহগুলো লিপিবদ্ধ কাগজের পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়, গড়িয়ে পড়ে।
বাবার সাথে আমারও শৈশব ছিল। শৈশবের মাঝে বাবার আদর্শ ছিল। ছিল ফুলের আসর, পাখির গান আর নির্ঝরণীর কলকল। জীবনের পেছনে রয়ে গেছে আমার স্মৃতিময় কিছু পড়ন্ত বেলা। আমি ফেলে এসেছি শিশির ¯িœগ্ধ ভোরের আলো, রোদেলা দুপুর আর অলস বিকেল বেলা। গাঁয়ের সবুজাভ পরিবেশে বাবার সাথে কেটেছি একখ- সোনালী জীবন। অন্যান্যদের মতো আমিও ছোট্ট জীবন বাবার কোলে রেখে এসেছি। এখন বাবাও নেই, বাবার সেই কোলও নেই। বয়ে চলা নদীর স্রোতে ভাটা পড়লে যে পিছুটান সৃষ্টি হয়, অসহায় অতীতকে ভাবলেও জীবনের গতিরোধে ছন্দপতন হয়।
এর ফলে অতীতের বেলাভূমি কিছুটা কাছে আনা যায়। ভুলে যাওয়া মুহূর্তকে ক্ষণিকের জন্য হলেও বের করা যায়। যদ্দরুণ মুছে যাওয়া আপনজনের দেখা মিলে। বাবাও এখন মনের মাঝে এক অমর পুরুষ। বিদায় নেওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে প্রতিদিন তার ছবি এ ক্ষত হৃদয়ে ভেসে ওঠ থাকে। ভাসমান ছবি নিয়েই আমি বাবাকে আপন ও যতন করে রেখেছি স্বপ্নের পৃথিবীতে। অমর করে রেখেছি হৃদয়ের ক্যাম্পাসে। তবে সেই ক্যাম্পাসে সহজে তাঁকে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে তার কয়েক ফোটা স্মৃতি আর বর্ণাঢ্য হায়াত।
কোনো সন্তান একজন বাবাকে হারিয়ে ফেললে যে পিছুটান হতাশা ভয় ও বিরহ বেদনা এবং কষ্ট যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় তা আমার বেলায় একটু বেশি হয়েছে। কারণ আমি সব সময় ছিলাম বাবার দৃষ্টি, কণ্ঠ এবং হাঁক-ডাকে। ঠিক তেমনি পেয়েছি আমার জনমদুঃখিনী মাকে। যে আশা-প্রত্যাশা আমার জীবনে এখন প্রেরণার ছবি আঁকে। আমি মায়ের চোখে এখন বাবার ছবি দেখি। আমারও একজন বাবা ছিল। তার সাথে ছিল ফসলের ক্ষেত বাগান বাড়ি আর স্মৃতিময় অনেক কথা আর স্বপ্ন। আমি ছিলাম মা বাবার আশার হৃদয়ে এক পৃথিবী প্রেরণা। তারা ছিলেন আমার জীবন সাজানোর আলোকিত নির্দেশনা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তানের মতো আমি ভালোবেসেছিলাম বাবাকে। কিন্তু আপন করে ধরে রাখতে পারিনি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ Ñএর এক মেঘলা দুপুরে আমার চোখের নদীতে জোয়ার তুলে বাবা হারিয়ে গেলেন অনেক অনেক দূরে। যেন এক বুক অভিমান নিয়ে ক্ষণস্থায়ী প্রেমের হৃদয়পাড়া শূন্য করে চিরস্থায়ী ভালোবাসার সন্ধানে বাবা চলে গেলেন আল্ল¬াহর সান্নিধ্যে। [ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন