রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সোনার গাঁও -ছানা উল্লাহ, সদস্য নং ৬৫


‘ঘুরে এলাম সোনার গাঁও’ ছোট এক টুকরো কাঁচের উপর সুন্দর করে লেখা। ২০ টাকা দাম। প্রথমে একটা কিনলাম হারিয়ে গেল। ফিরে আসার সময় স্মৃতি হিসেবে রাখার জন্য আরেকটা কিনে নিলাম। সোনার গাঁও শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম গত ১৭ ডিসেম্বর।
ফজরের নামাজ পড়েই রওয়ানা দিলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে ৮টা। জাদুঘরে ঢুকলাম সাড়ে ১০টায়। প্রথমেই চোখ পড়লো গরুর গাড়ির উপর। গাড়ির পিছন দিয়ে ঠেলছে দু’জন। মাটি দিয়ে তৈরি এ গাড়ি মনে করিয়ে দেয় গ্রামের কথা। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে এখানে অনুষ্ঠান হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়েছিল কাঠ দিয়ে তৈরি নানা রকম জিনিস; নৌকা, পুতুল, মাছ আরো কত কী। দেখতে খুব সুন্দর লাগে তাদের। ঈসা খাঁর বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাথরে খোদাই করা ১৩০৮ খ্রিস্টাব্দ। দেখলে মনে হয় না ৭০০ বছর পূর্বে তৈরি করা হয়েছে। যেন কয়েক দিন আগের তৈরি করা। নির্মাণ কাজ চলার কারণে ভেতরে ঢুকতে পারলাম না। তবে বাড়ির গেট দেখে মনে হলো ঈসা খাঁর সাথে ঠিক মানানসই হয়েছে। ঈসা খাঁ শুধু সাহসিই ছিলেন না বরং সুরুচিরও অধিকারী ছিলেন, এ বাড়িটিই তার প্রমাণ। বড় চমৎকারভাবে সাজিয়েছেন বাড়িটি। দুপাশে দুটি পুকুর। চোখ না জুড়িয়ে যাবে কোথায়!
ঈসা খাঁ-সহ আরো কতো মুসলিম শাসক এখানে রাজত্ব করেছেন তাদের কোনো ভাস্কর্য চোখে না পড়লেও বঙ্গবন্ধু আর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ভাস্কর্য ঠিকই চোখে পড়লো। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে মুসলমানরা বিধর্মীদের এ কালচার গ্রহণ করছে।
জাদুঘরের বাইরে দেখি ঐতিহ্যবাহী বাংলার কতো জিনিস সাজানো রয়েছে। ঢুকলাম লোক শিল্প জাদুঘরে। লোক শিল্প নিয়ে একটি গল্পও পড়েছি ইতিপূর্বে। কৌতূহলী চোখ প্রথমে পড়লো সুন্দর করে সাজানো নৌকার ওপর। কাঠের শিল্পে বাঙ্গালীরা পিছিয়ে নেই, তার প্রমাণ এই জাদুঘর। ভারী সুন্দর কাঠের পালকি, পালঙ্ক, সিন্দুক। আরো নাম না জানা কতো জিনিস! নকশী কাঁথার নাম অনেক শুনেছি কখনো দেখার সুযোগ হয় নি। তাই ভালোভাবে দেখলাম কাঁথাগুলো। উপরে কতো রকম ছবি আঁকা। সবটাই সমান সুন্দর। একটি বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা। এটি সংগ্রহ করা হয়েছে রংপুর থেকে। হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালোবেসে নিংড়ে দিয়েছে সবার জন্য। সত্যিই অদ্ভুত।
আরো অদ্ভুত লাগলো প্রাচীন বাংলার অলংকারগুলো দেখে। অদ্ভুত তাদের নাম। তাতে বারী অলংকার তারা কীভাবে ব্যবহার করতো তাই ভেবে পেলাম না। আরও আছে কাসা আর পিতলের নানা জিনিস। জাদুঘর থেকে বের হয়ে সোজা চলে এলাম পূর্ব দিকে। প্রথমেই নজড় পড়লো একটি লাইব্রেরীর দিকে। তাতে রয়েছে ইতিহাসের অনেক বই। লাইব্রেরীর সামনে দিয়েই বিশাল এক দিঘী। তাতে রয়েছে ছোট ছোট নৌকা। ইচ্ছে করলে নৌকা ভ্রমণের স্বাদটাও মিটিয়ে নেয়া যায়। আরো সামনে এগিয়ে দেখলাম পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর ঘর। আছে সুন্দর দোকান। যেগুলোর দিকে চেয়ে থাকতে মন চায়। এখানে বিক্রি হয় জামদানী শাড়ি, মাটি আর কাঠের তৈরি নানা জিনিস।
এখানে প্রতিটি জিনিসই সুন্দর। বেশি সুন্দর পরিবেশ। ফেরিওয়ালা, মদখোর, পকেটমারদের দেখা মিলবে না এখানে। কপোত আর কপোতি জোড়াগুলোও দেখা ভার। এখানে যা আছে তা এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। গ্রামীণ পরিবেশ আর প্রাচীন সরঞ্জাম দুয়ে মিলে অপূর্ব করে তুলেছে সোনার গাঁওকে। বিশাল জায়গা জুড়ে এর সীমানা। এক পাশ না ঘুরতেই আযান হয়ে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে নামাজ পড়ে ‘পানাম সিটিতে’ গেলাম। মোঘলদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য ঈসা খাঁ যেই পরিখা খনন করেছিলেন তা আজও অক্ষুণœ আছে। বাড়িগুলো দেখলে মনে হয় এখনই ভেঙ্গে পড়বে। মাংস বলতেই কিছুই নেই যা আছে তা সেগুলোর হাড়। তাই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। ঘুরতে ঘুরতে আসর হয়ে গেল। নামাজ পড়ে রওয়ানা দিলাম। পথে গাড়ি থামিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ে নিলাম।
শিক্ষা সফরে অনেক কিছুই দেখলাম দু’চোখ দিয়ে। চোখ জুড়ালেও মন জুড়ায়নি। কারণ উপমহাদেশের হাদীসের প্রথম দরসদানকারী শায়েখ আবু তাওয়ামাহ রহ. এর কবর জিয়ারত করা হয়নি, তাই আফসোসের সঙ্গে বলতে হচ্ছে-
এত দেখেও যেন কিছুই দেখা হলো না/এতো ঘুরেও যেন কিছ্ইু ঘুরা হলো না। ‘ঘুরে এলাম সোনার গাঁও’ এ যে কেবল এক টুকরো কাঁচের আয়নার ওপর কয়েকটি শব্দ।
দ্বাদশ শ্রেণী, জামিয়াতুর রাশাদ একাডেমী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন