রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

বড় যদি হতে চাও- মুহাম্মাদ যাইনুল আবেদিন

http://misbahul17.blogspot.com/
(১ম কিস্তি)
বাদশা হারুনুর রশীদ- পৃথিবীর ইতিহাসে পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বল এক নাম। আব্বাসী শাসনের তারকা-পুরুষ। সবচে’ বিখ্যাত এই আব্বাসী খলীফা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন দুঃসাহসী। জন্মেছিলেন ১৪৯ হি. ৭৬৬ ঈ. সালে। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ১৭০ সালে বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের খলীফা হোন। তার খলীফা হওয়ার ঘটনাটিও কম চমৎকার নয়। ১৭০ সাল। পনের রবিউল আউয়াল। শুক্রবার। তার সহোদর বাদশা হাদী ইবনে মাহদী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- এই রাতেই তাকে হত্যা করবেন। আল্লাহর কুদরত- হাদী নিজেই এই রাতে মারা যান।
রাতেই সমকালীন মুসলিম জাহানের খলীফা নির্বাচিত হোন হারুনুর রশীদ। এর খানিক পরে- ওই মজলিসেই হারুনকে তার পুত্রসন্তান জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়। তার নাম মামুনুর রশীদ। এক বিরল রজনী। এক বাদশা মারা যাচ্ছেন; দ্বিতীয় বাদশা সিংহাসনে সমাসীন হচ্ছেন এবং তৃতীয় বাদশা জন্মগ্রহণ করছেন। [আল্লামা ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া- ৯ : ১৩১] ইবনে দিহয়া লিখেছেন-
وفي أيامه كملت الخلافة بكرمه وعدله وتواضعه وزيارته العلماء في ديارهم
‘হারুনুর রশীদের আমলেই খেলাফত পূর্ণতা লাভ করে- তাঁর ঔদার্য ইনসাফ বিনয় এবং আলেমগণের ঘরে ঘরে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে।’
তাছাড়া হারুন ছিলেন বিদ্বান এবং বিদ্যোৎসাহী। আরবী সাহিত্য, আরব ইতিহাস এবং হাদীস ও ফেকাহশাস্ত্রে ছিল তার অগাধ জ্ঞান। প্রতিষ্ঠিত কাব্যপ্রতিভায় ঋজু এই শাসকপুরুষ যুদ্ধ ও অভিযানে ছিলেন অভ্যস্ত দুঃসাহসে খ্যাতিমান। রাতের নিশুতি প্রহরে প্রজাদের অবস্থা দেখার জন্যে একা বেরিয়ে পড়তেন ছদ্মবেশে। এক বছর হজে যেতেন আরেক বছর যেতেন যুদ্ধে। প্রজ্ঞা সততা ও সাহসে মাত্র তেইশ বছরে আব্বাসী শাসনকে তিনি উপমাময় করে তুলেছিলেন। [যিরাকলী, আলআ’লাম- ৮ : ৬২] ঘটনাটি ইতিহাসের এই তারকাশাসকের। বাতাসের ডানায় ডানায় উড়ে বেড়ায় তখন তার নাম। তিনিই একবার রাককায় আসেন। নির্মিত হয় অবকাশমহল। উঠেন অবকাশমহলে। আর ঠিক সেই সময়েই রাককায় আগমন করেন হাদীসশাস্ত্রের অমর মনীষী- আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস- আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.। বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। একনজর দেখার জন্যে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পায়ের জুতা ছিন্ন হয়ে পড়ে। উড়তে থাকে ধুলো। হারুনুর রশীদের সঙ্গিনী মহল থেকে উকি দিয়ে দেখেন এই উৎসবদৃশ্য। অবাক হোন। বলেন- এ কি হচ্ছে? দরবারে উপস্থিত লোকেরা বলল- খুরাসানের আলেম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এসেছেন। তাঁকে দেখার জন্যে এভাবে ভিড় করছে মানুষ। তখন ওই খলীফাসঙ্গিনী বললেন-
هذا والله الملك، لا ملك هارون الذي لا يجمع الناس إلا بشرط وأعوان
খোদার কসম! এই না রাজত্ব! হারুনের রাজত্ব কী- তিনি তো পুলিশ ও সহযোগী ছাড়া মানুষ জমাতে পারেন না! [আল্লামা যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা- ৭ : ৬০২, তরজমা : ১২৮৪]
***
এখানে দুই সম্রাট মুখোমুখি। একজন মাটি ও রাষ্ট্রের সম্রাট আরেকজন সম্রাট জ্ঞানের- নববী ইলমের। একজনের শাসন চলে পিঠে আরেকজনের শাসন চলে অন্তরে। একজনের রাজত্ব পুলিশ ছাড়া অচল আরেকজনের রাজত্বে পুলিশ নিষিদ্ধ।একজনের রাজত্ব দু’দিনের আরেকজনের রাজত্ব অমর। কী আশ্চর্য! একজন নারীও বুঝেন এই পার্থক্য! অথচ এই শ্রেষ্ঠ রাজত্বের দরজা সকলের জন্যে উন্মুক্ত। হয়তো এর জন্যে চাই কিছু নিদ্রাহীন রাত; যোগ্যজনের নিবিড় সান্নিধ্য এবং লক্ষ্য অর্জনে মনোযোগী সংগ্রাম। তবে মাটি ও কুরসীর রাজত্ব লাভের মতো খুনোখুনি নেই এখানে; নেই বন্য খাঁচায় প্রাণ হারাবার সার্বক্ষণিক ভয়। বড় হতে হলে- অন্তত জ্ঞানের জগতে- প্রথমে দেখতে হয় স্বপ্ন। তবে ঘুমের ঘরে দেখা স্বপ্ন নয়। ঘুমের স্বপ্ন তো নিদ্রাজগতের সুখ। এই জাগ্রত পৃথিবীতে ‘রাজা’ হতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে জাগ্রত বসে।
কথা কি- পৃথিবীর সুস্থ সচেতন সকলেই বড় হতে চায়। এও সত্য, সকলেই বড় হয় না। বড় হতে হলে প্রথমত কে বড়, কাকে বড় বলা হয়- তা জানতে হবে সবার আগে। এক মমতাময়ী মা। দেখলেন রাজা যাচ্ছেন। ছোট্ট শিশুকে বললেন- দেখ বাবা হাতি চড়ে রাজা যায়। তার সঙ্গে কতো মানুষ। আর দেখ, সবাই রাজাকে দেখার জন্যে কী করছে। যদি লেখাপড়া করো তুমিও বড় হয়ে রাজা হবে। কেমন? ছেলে বলল, হ্যাঁ মা তাই হব। একটু চুপ থেকে আবার বলল- রাজা কোনটা আর হাতি কোনটা?
ওই শিশুর কথায় আমাদের হাসি পেলেও আমরা আমাদের জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই কোনটা রাজা আর কোনটা হাতি- তা চিনতে ভুল করি! আমরা যদি বড় হতে চাই তাহলে প্রথমে বড়দের জানতে হবে; জানতে হবে ইতিহাসের অবিসংবাদিত অমর সম্রাটদের।
আমাদের ইতিহাসের এক বরিত সম্রাট ইমাম মালেক রহ.। কী ধনে ধনী ছিলেন, ছিলেন সম্রাটেরও সম্রাট! মুহাদ্দিস খালাফ ইবনে আমর বর্ণনা করেন- ইমাম মালিকের মজলিসেই বসা ছিলাম। পাক মদীনার কারী ইবনে কাসীর এলেন। হযরত ইমামের হাতে একটি চিরকুট তুলে দিলেন। ইমাম মালেক পড়লেন, তারপর জায়নামাযের নীচে রেখে দিলেন। দরবার ভেঙে গেল। সবাই যখন চলে যাচ্ছে আমিও উঠতে গেলাম আর বললেন- তুমি একটু বস। তারপর সেই চিরকুটটি বের করে আমার হতে দিলেন। দেখলাম তাতে লেখা- ‘আমি স্বপ্নে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম। কে যেন বলছিল- ইনি আল্লাহর রাসূল! লক্ষ করলাম- নবীজি বসে আছে। মানুষের ভীষণ ভিড়। কেউ এসে বলছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিছু দান করুন। কেউ বা বলছে, হে রাসূল! আমাকে কিছু দিতে বলুন। নবীজি বললেন কি- আমি আমার মিম্বরের নীচে প্রভূত সম্পদ জমিয়ে রেখেছি আর মালেককে বলেছি- ওগুলো বণ্টন করে দিতে! এবার তোমরা মালেকের কাছে যাও। দেখলাম- তারা নবীজির দরবার থেকে উঠে যাচ্ছে। এক ব্যক্তি বলছে- দেখি মালেক কী করেন! আরেকজন বলছেন- নবীজি যা বলেছেন মালেক তাই করবেন।’ খালাফ বলেন- তাকিয়ে দেখি ইমাম মালেক অঝোরে কাঁদছেন। আমি উঠে চলে এলাম। [কাজী সুলায়মান সালমান মানসূরপুরী, তারীখুল মাশাহির- ২৯ পৃ.] মূলত নবীজির মিম্বরের নীচে সঞ্চিত ও রক্ষিত এই ভাণ্ডার পেয়েই আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক হয়েছিলেন সম্রাটের চেয়েও বড় সম্রাট! এই ধন সম্রাটদের ধনাগারের ধনের চাইতেও দামি। এই ধনের পরশ ছাড়া জগতের সম্রাটগণও অচল। প্রখ্যাত আব্বাসী খলীফা মাহদী। হারুনুর রশীদের তিনি বাবা। হজ উপলক্ষে মদীনায় এসেছেন। দেখা করতে গেলেন ইমাম মালেক রহ.। বাদশা মাহদী বিনম্র শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা জানান মদীনার ইমামকে। প্রিয় পুত্র মূসা এবং হারুনকে আদেশ করেন তাঁর কাছে হাদীস পড়তে। পরে রাজকর্মকর্তাগণ ইমাম মালেককে এই উদ্দেশ্যে আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বাদশা মাহদী এর কারণ জানতে চাইলে ইমাম মালেক বলেছিলেন- এই ইলম খুবই সম্মানিত ধন! এই ধন নিতে হলে নিজে আসতে হয়। পরে বাদশা মাহদী তার পুত্রদ্বয়কে ইমাম মালেকের কাছে গিয়ে হাদীস পড়তে পাঠিয়ে দেন। এই হলো নবীজির রেখে যাওয়া ধন ভাণ্ডারের মান ও মূল্য। [মাওলানা কাজী আতহার মোবারকপুরী, আইম্মায়ে আরবায়া- ১১১-১১২ পৃ.] জগতের আরেক বরিত ইমাম শাফেঈ রহ.। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর উস্তাদ। আবার শিষ্য ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর। ছিলেন অত্যন্ত তুখোর মেধাবী। মক্কা মুকাররমায় মকতব থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। পবিত্র মক্কার সম্মানিত শিক্ষকগণের কাছে হাদীস ও ফেকাহ পড়ার পর ঝুকে পড়েন সাহিত্য কবিতার প্রতি। তাছাড়া আরব ইতিহাসেও পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন একেবারে অল্প বয়সে। তারপর এক বুজুর্গ ব্যক্তির পরামর্শে মদীনায় যান ইমাম মালেকের সান্নিধ্যে।
এই গল্প ইমাম শাফিঈ নিজের বর্ণনা করেছেন। বলেছেন- আলে যুবায়ের এর এক ব্যক্তি একবার আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন- এতটা ভাষাপাণ্ডিত্য এবং প্রখর মেধা সত্ত্বেও ইসলামের গভীর জ্ঞান থেকে তুমি বঞ্চিত- এটা ভাবতেও আমার কষ্ট হয়। বললাম- ফেকাহ তথা ইসলামের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য আমি কোথায় যাব? বললেন-
هذا مالك، سيد المسلمين اليوم
কেনো, এই ইমাম মালেক! বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানদের ইমাম! এর পর আমি মাত্র নয় রাতে ইমাম মালেকের মুয়াত্তা মুখস্থ করে ফেললাম।
এদিকে মক্কার গভর্নরের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তাকে বললাম- ইমাম মালেক এবং পবিত্র মদীনার গভর্নরের নামে চিঠি লিখে দিতে। তিনি চিঠি লিখে দিলেন। চিঠি হাতে ছুটে গেলাম মদীনায়। পাক মদীনার গভর্নরের হাতে তার নামে লেখা মক্কা মুকাররমার গভর্নরের চিঠিখানা দিয়ে বললাম- আপনি কাউকে দিয়ে ইমাম মালেকের কাছে এই পত্রখানা পৌঁছে দিয়ে তাঁকে এখানে ডেকে পাঠান এবং আমার জন্যে একটু সুপারিশ করে দিন।
পবিত্র মদীনার গভর্নর বললেন- ভালো হয় আমি নিজেই আপনাকে নিয়ে তাঁর দরবারে যাব। তার ঘরের দুয়ারে খানিকক্ষণ বসে থাকব। আকীক প্রান্তরের ধুলোবালি আমাদের মুখে এসে পড়বে। তারপর হয়তো সাক্ষাতের অনুমিত লাভে ধন্য হব। যাই হোক আসর নামায পড়ে মদীনার গভর্নর তার সেবক ও দলসহ রওনা হলেন। সঙ্গে আমি আছি। আকীক প্রান্তরে বাড়ি ইমাম মালিকের। সেখানে পৌঁছে গেলাম আমরা। প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করা হলো। একজন দাসী এসে বললেন, শায়েখ বলছেন- মাসয়ালা জানতে চাইলে কাগজে লিখে দিন, শায়েখ উত্তর বলে দিবেন। পবিত্র মদীনার গভর্নর বললেন- গিয়ে বলো, বিশেষ এক প্রয়োজনে মক্কা মুকাররমার গভর্নর একটি পত্র পাঠিয়েছেন। একথা শুনে দাসী ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ইমাম মালেক বেরিয়ে আসেন। পবিত্র মদীনার মাননীয় গভর্নর তাঁর হাতে পবিত্র মক্কার গভর্নরের পত্রখানা তুলে দেন। পত্রটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করেন। পড়তে পড়তে সুপারিশ-বাক্যটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেন-
يا سبحان الله! وصار علم رسول الله صلى الله عليه وسلم يوخذ بالوسائل
সুবহানাল্লাহ! হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইলম সুপারিশের মাধ্যমে শেখা হচ্ছে?!
লক্ষ করলাম- মদীনার গভর্নর কথা বলতে ভয় করছেন। তখন আমিই এগিয়ে গেলাম। সবিনয়ে আরজ করলাম- আমি একজন মুত্তালেবি খান্দানের মানুষ। আমার পুরো কাহিনী এই…। তিনি আমাকে ভালো করে দেখলেন। নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম- আমার নাম মুহাম্মদ। বললেন-
يا محمد!اتق الله واجتنب المعاصي فإنه سيكون لك شان من الشان
মুহাম্মদ! আল্লাহকে ভয় করো, পাপ থেকে বেঁচে থেকো! ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে তুমি। [ঐ : ১৪৪-১৪৫] এই হলো নবীজির ইলমের মান। দুনিয়ার মান্যবর শাসকের সুপারিশও এখানে কলঙ্কতুল্য। তাছাড়া সমকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসকের রাজপুত্রও যদি চায় এই ইলম ও জ্ঞানের পরশ তাহলে তাকেও বিনম্র শ্রদ্ধায় হাজির হতে হবে এই দরবারে!
হযরত ইমাম আবু দাঊদ রহ.কে আমরা জানি। হাদীসশাস্ত্রের অবিসংবাদিত ইমাম। ইমাম বুখারীর সমকালীন মনীষী। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের ছাত্র। ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসাঈ তাঁর ছাত্র। জন্ম ২০২ হি. ওফাত ১৭৫ হি.। পাঁচ লাখ হাদীস থেকে চার হাজার আটশ হাদীস নির্বাচন করে তার সুনানগ্রন্থ সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন। [যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা- ১৩ : ২০৯ পৃ.; মাওলানা হাবীবুর রহমান আযমী, মাকালাত- ৩ : ১৫৭ পৃ.] নবীজির রেখে যাওয়া এই ওহীর জ্ঞান তাঁকে কতটা বড় করেছিল দুটি সরল উপমা দিই। ইমাম আবু দাউদ রহ. একবার নৌপথে সফরে বেরিয়েছেন। বিশাল জলজাহাজ। নদীর বুকে নোঙর করেছে। ইমাম আবু দাউদ বসে আছেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন- নদীর তীরে এক ব্যক্তি হাঁচি দিল এবং আলহামদুলিল্লাহ বলল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এক দেরহাম দিয়ে একখানা ডিঙি ভাড়া করে তীরে ছুটে গেলেন। হাঁচির উত্তর দিয়ে আবার তার জাহাজে ফিরে এলেন। সফরসঙ্গীগণ জানতে চাইল- হঠাৎ ডিঙি ভাড়া করে ছুটে গেলেন আবার ফিরে এলেন সঙ্গে সঙ্গে! ব্যাপারখানা কি? বললেন- লোকটির হাঁচি ও তার আলহামদুলিল্লাহ শুনে এই ভেবে ছুটে গেলাম- হয়তো লোকটি আল্লাহর কোনো মকবুল ও মুসতাজাবুদ দাওয়াত বান্দা হবেন। আমি তার আলহামদুল্লিাহ এর পিঠে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললে যদি সে ‘হাদানাল্লাহ’ আল্লাহ আমাদের হেদায়াত দান করুন বলে দোয়া করে দেয়- সেই দোয়া হয়তো আল্লাহ কবুল করে নিবেন। ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন- রাতের বেলা যখন সকলে নিবিড় ঘুমে বিভোর তখন অদৃশ্য থেকে একটা আওয়াজ এলো-
يا اهل السفينة ان ابا داود اشترى الجنة بدرهم
হে কিশতিবাসী! আবু দাউদ এক দেরহাম দিয়ে বেহেশত কিনে নিয়েছে।
[মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী, ইমাম আবু দাউদ আওর ইলমে হাদীস- ২২ পৃ. খাত্তাবীর মাআলিমুস সুনান এর মুকাদ্দিমার সূত্রে] আরেকটি উপমা। আওলিয়া জগতের সম্রাট সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুসতারী রহ.। জন্ম ২০০ হি. ওফাত ২৮৩ হি.। জগতের পীর আওলিয়াগণ যাকে সাহল তুসতারী নামেই জানেন। একবার ইমাম আবু দাউদ রহ. এর কাছে এসে সবিনয়ে আরজ করলেন- আপনার কাছে আমার একটা দরকার আছে। ইমাম আবু দাউদ বললেন, বলুন কী দরকার? বললেন- আগে ওয়াদা করুন, যদি সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই তা পূরণ করবেন! কথা দিলেন ইমাম আবু দাউদ। তখন শায়েখ তুসতারী বললেন-
اخرج الي لسانك الذي حدثت به احاديث رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى أقبله
যে জিহ্বা দিয়ে আপনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেন সেই জিহ্বাটি একটু বের করে দিন আমি তাতে চুমু খাব!
فأخرج اليه لسانه فقبله
তিনি তার জিহ্বা বের করে দেন, শায়েখ তুসতারী তাতে চুমু খান। [ওফায়াতুল আ’য়ান, তরজমা : ২৭২ এর সূত্রে মাকালাতে হাবীব- ৩ : ১৮২] আমাদের ইতিহাসের এই বাতিঘর জ্বলেছিল আফগানিস্তনের সিসতান শহরে। ২২০ সালে ঘর ছাড়েন ইলমের সন্ধানে। প্রায় বিশ বছর যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর সমকালীন সব জ্ঞানের শহরে। জ্ঞানের তীর্থভূমি ইরাক ও বাগদাদে আসেন বারবার। তিলে তিলে গড়ে ওঠেন তিনি জ্ঞানের মহীরুহরূপে। পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম বাতাসের ডগায় ভর করে। নিবাস পাতেন বাগদাদে। জ্ঞানের তৃষ্ণায় ব্যাকুল শিক্ষার্থীদল পতঙ্গের মতো সমবেত হতে থাকে তার দুয়ারে। প্রাণে চঞ্চল হয়ে উঠে বাগদাদ। ঠিক এই সময়কার কথা। ইমাম আবু দাউদ রহ. এর খাদেম আবু বকর ইবনে জাবের বলেন- আমি হযরত ইমামের সঙ্গে বাগদাদেই ছিলাম। মাত্র মাগরিব নামায শেষ করেছি। দরজায় আওয়াজ হলো। দরজা খুললাম। এক ব্যক্তি বলল- খলীফাতুল মুসলিমীনের ভাই ও যুবরাজ আমীর আবু আহমাদ আলমুয়াফফাক সাক্ষাতের অনুমতি চাচ্ছেন। আমি হযরত ইমাম রহ.কে বললাম। তিনি তাকে আগমনের অনুমতি দিলেন। আসার পর ইমাম আবু দাউদ তাকে বললেন- এই সময়ে কেন কষ্ট করে এ পর্যন্ত এলেন? আমীর মহোদয় বললেন- তিনটি উদ্দেশ্যে এসেছি। বললেন- বলুন! আমীর মহোদয় বললেন- এক. আপনি বসরা চলুন। সেখানেই নিবাস গ্রহণ করুন, যেন আপনার অবস্থানের ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হাদীসপিপাসুগণ সেখানে আগমন করে। আর আপনার পদচারণায় যেন বসরা আবাদ হয়ে উঠে। কেননা, দাসরা বসরাকে খুনোখুনি করে একেবারে বিরান করে ফেলেছে।
ইমাম বললেন- প্রথমটি হলো। দ্বিতীয়টি বলুন! আমীর বললেন- আমার সন্তানদেরকে আপনার সুনানগ্রন্থটি পড়িয়ে দিবেন। বললেন, ঠিক আছে। তৃতীয়টি বলুন! আমীর বললেন : আমার সন্তানদেরকে স্পেশাল বৈঠকে পড়াবেন। কারণ বাদশাদের সন্তানরা সাধারণ লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করে না। হযরতুল ইমাম বললেন-
اما هذه فلا سبيل اليه، لأن الناس شريفهم ووضيعهم في العلم سواء
‘আপনার এই আবদার রক্ষা করার কোনো উপায় নেই। কারণ ইলমের ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত ও অসম্ভ্রান্ত সব সমান।’
সমকালীন পৃথিবীর সবচে বড় সাম্রাজ্যের যুবরাজ এসেছেন যাঁর দরবারে আবদার নিয়ে- তাঁকে বড় বলব না তো কাকে বড় বলব? এসেছেনও স্বীয় আত্মজের কপাল উজ্জ্বল করার জন্যে। এবং এসেছেন তার বিরান হয়ে পড়া শাসিত অঞ্চলকে আবাদ করার জন্যে। এই হলো ইলম ও উলামার মূল্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়- দাসবিদ্রোহের নেতা আলী ইবনে আবদুর রহীম এর উত্থান হয় ২৫২ হি. সালে। ২৫৫ সালে পুরো বসরা কবজা করে বসে। এসময় প্রায় ১২ হাজার বসরী নাগরিককে হত্যা করে সে। অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর ভয়ে বনে গিয়ে আত্মগোপন করে। জীবন সম্পদ এবং ইজ্জত কোনটাই নিরাপদ ছিল না সেখানে। সম্ভ্রান্ত নারীদের দাসী বানিয়ে বাজারে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে ইসলামী জ্ঞান সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি এই বসরা বিরান হয়ে পড়ে। ইরাক ও তার কেন্দ্রীয় শহরগুলোর এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে অবশেষে যুবরাজ আবু আহমাদ নিজে যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধে দাসদের পরাজিত করেন। যুদ্ধে নিহত হয় আলী ইবনে আবদুর রহীম নিজে। ২৭০ সালে দখলকৃত হয় বসরা। কিন্তু হারানো জীবন ফিরে পাচ্ছিল না ঐতিহ্যের এই শহর। ইমাম আবু দাউদের দরবারে স্বয়ং যুবরাজ হাজির হয়েছেন তাঁকে এসে তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় এই শহরের হারানো প্রাণ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে! [মাআলিমুস সুনান- ১ : ১২; মাকালাতে হাবীব- ৩ : ১৫৮-১৫৯ পৃ.]
****
সত্যি কথা কি, বড় হবার প্রেরণা জীবন্ত সব অন্তরেই প্রোথিত। অনেক দিন আগের একটি গল্প মনে পড়ল। ১৯৯৪ কি ’৯৫ সালের কথা। ময়মসনসিংহ জামিয়া ইসলামিয়ায় তখন শিক্ষকতা করি। দপ্তরে তালিমাতে বসে আছি আমি ও মুফতী শামছুল ইসলাম সাহেব রহ.। এক ভদ্রলোক সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। মুফতী সাহেবই জিজ্ঞেস করলেন- কে রে আইছুইন? মানে কেন এসেছেন? ভদ্রলোক বললেন, আমার দুইজন ছেলে আছে। ওদেরকে মাদরাসায় ভর্তি করব। সুন্দর দেখে দুটি নাম রেখে দিন! মুফতী সাহেব আমাকে দেখিয়ে বললেন- হুজুরকে ধরেন। ভালো নাম পাবেন। ভদ্রলোক আমার দিকে ফিরে বললেন- দেইন হুজুর দুইডা ভালা নাম! বললাম- নাম কি আগে রাখেন নাই? বললেন, রেখেছি সুন্দর না। বললাম- আপনার নাম কি? বললেন, তারা মিয়া। আমি বললাম- তাহলে একজনের নাম চান মিয়া আরেকজনের নাম সুরুজ মিয়া রাখেন, পুরো আসমানটাই আপনার দখলে চলে আসবে। ভদ্রলোক কিছুটা ক্ষুণ্ন হলেন। বললেন- মশকরা করোইন? মুফতী সাহেব কথা টেনে নিয়ে বললেন- আপনি কী রকমের নাম চান? বললেন- এই যেমন আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলের নাম সুবহান। নামায পড়ার সময় আমরা ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ বলি। এমন নাম যাতে নামাযে সবাই বলতে হয়। মুফতী সাহেব হাসলেন। বললেন- এক ছেলের নাম শামছুল ইসলাম আরেক ছেলের নাম কামরুল ইসলাম রাখুন। অনেক বড় বড় আলেমের নাম। বড় বড় আলেম শুনতেই দেখলাম ভদ্রলোক ঘাড় নুইয়ে দিলেন। বললেন- ‘ঠিক আছে, কাগজে লেইখ্যা দেইন।’ তারপর খুশি মনে চলে গেলেন!
এ হলো ‘বড়’ শব্দের জাদু। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যে বাদাম বিক্রি করে সেও স্বপ্ন দেখে নেতা হওয়ার, অনেক বড় নেতা! ভুলটা হয় বড়টা চিনতে। একজন নেতা অমিততেজ সাহসে বুক টান করে দাঁড়ায়। দেশ কাঁপে থরথর তার নামে। ক’দিন পর সিঁড়িতে কিংবা পথে পড়ে থাকে তার লাশ। মানুষ ‘আহা’ শব্দটিও বলে না- একি কোনো বড় হওয়া হলো?
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কথা বলি! বড় মানুষ ছিলেন। স্বার্থের ভিখারী শাসক তাকে চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত করেছিল। নোয়াতে চেয়েছিল তার মস্তক। পারেনি। যখন উম্মাহর এই মুকুটবিহীন সম্রাট মারা যান তার জানাযায় মানুষের ঢল নামে। বাদশা মুতাওয়াক্কিল তাঁর জানাযার জায়গাটা মেপে দেখার নির্দেশ দেন। জায়গা মেপে অনুমান করা হয় অন্তত পঁচিশ লাখ মানুষ তাঁর জানাযা পড়েছে। আবদুল ওয়াহহাব অররাক বলেছেন- ইসলাম কিংবা ইসলাম-পূর্বকালে এত বড় জানাযার কোনো নজির পাওয়া যায় না। এখানেই কি শেষ? এই জানাযা দেখে ২০ হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। [মাওলানা সালমান মানসূরপুরী, আল্লাহ সে শরম কিজিয়ে, আলবিদায়া ওয়াননিহায়ার সূত্রে- ২৭৩ পৃ.] তাছাড়া জগতে কে চিনে এখন বাদশা মুতাওয়াক্কিলকে। সে এখন পুরনো ইতিহাসের পাতায় বন্দী পাঁচ হরফের একটি কালো রেখা মাত্র! আর ইবনে হাম্বল আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র!
এই আমাদের ইমাম আবু হানীফা রহ. এর কথাই বলি! ইতিহাসের আকাশে অন্তহীন আলো-ছড়ানো এক নাম। বাতাসে বাতাসে তাঁর নাম। তাঁর জীবদ্দশাতেই ইরাক থেকে মক্কা-মদীনার পবিত্র ভূমি অতঃপর সুদূর মিশর পর্যন্তও ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর নাম, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মদির সুরভি। হিংসে পুড়ে ছাই হয়েছিল সমকালীন শাসকের অন্তর। সে ছিল বাদশা আবু জাফর মনসূর আব্বাসী। কূফা থেকে বাগদাদে ডেকে এনে তার অধীনে ইসলামী রাষ্ট্রের বিচারপতি হতে বলে। হযরাতুল ইমাম শাসকের এই অধীনতা প্রত্যাখ্যান করেন। জ্বলে উঠে রাজরোষ! নির্দেশ দেয় জেলে পাঠাবার এবং প্রতিদিন জল্লাদের হাতে দশটি করে বেত্রাঘাতের। তখন তাঁর বয়স আশি। কী নির্মম ও পাথর মন। বেত্রাঘাত করা হতো। রক্তাক্ত ইমামকে বাজারে ঘুরানো হতো। এভাবে দশ দিন শাস্তি দেয়ার পরও যখন ইমাম মাথা নত করেন নি- পাহাড় তো মাথা নত করতে জানেও না! তাঁকে শহীদ করা হয় বিষ খাইয়ে। হযরাতুল ইমাম যখন মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করেন মহান প্রভুর দুয়ারে সেজদায় লুটে পড়েন, উড়ে যায় প্রাণপাখি আরশে! সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের বেগে। ভিড় বাড়তে থাকে। জায়গা কোথায় এত ভক্তজনের। অনন্তর ছয়বার জানাযা পড়তে হয় এই হলো আমাদের বড়! [তাবঈযুস সহীফা, টীকা : আশেক এলাহী বারনী- ১১২ পৃ.] কোথায় আজ আবু জাফর মনসূর!? ইতিহাসের পাতায় পড়ে থাকা কতিপয় কালো বর্ণ মাত্র। আর আবু হানীফা! সে তো পূর্ণিমার চাঁদ। পৃথিবীর পূবপশ্চিম এখনো সুবাসিত তার নামে ও জ্ঞানে! কারণ তিনি আমাদের নবীজির রেখে যাওয়া যে ইলম ও জ্ঞানের পরশে নিজেকে বড় করে নির্মাণ করেছিলেন তা কোনো দিন হারায় না, ম্লান হয় না। বড় হতে হলে এই বড়দের জানতে হবে! আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে কী চমৎকার বলেছেন-
اِنَّمَا یَخْشَی اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا
বান্দাদের মধ্যে আল্লাহকে যথার্থ ভয় করেন তো আলেমগণই!
যারা আল্লাহর ভয়কে সযতনে লালন করেন হৃদয়ের গহিনে তাদের আর কোনো ভয় থাকে না। ইবনুল মুবারক আবু দাউদ মালিক আহমদ আবু হানীফা এই মন্ত্রেই বেড়ে উঠেছিলেন। পৃথিবী এখনো আবাদ চঞ্চল তাঁদেরই নামে। সাধেই কি সায়্যিদুনা আলী মুরতাজা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
رضينا قسمة الجبار فينا/لنا علم وللجهال مال
বণ্টক যখন খোদ দয়াময় আমরা তাতেই রাজি
মোদের তরে জ্ঞানের মশাল-ওদের বিত্তরাজি।
[চলবে- বি ইযনিল্লাহ]

(২য় কিস্তি)
বড় হতে হলে প্রথমে জানতে হয়- কে বড়! তারপর স্বপ্ন দেখতে হয় বড় হওয়ার। স্বপ্ন মানুষ দুইভাবেই দেখে- জেগে এবং ঘুমে। ঘুম মৃত্যুর বন্ধু। তাই ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা আর মৃত্যুর কোলে বসে স্বপ্ন দেখা একই কথা। তারপরও পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই ভালোবাসে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে। এই অলসস্বপ্নের মজাই আলাদা। মুহূর্তে রাজা! এই রাজাস্বপ্নের কত গল্প। বল্টুর ঘরে সৎ মা। দুঃখের তার অন্ত নেই। চোখের জল তার শুকোয় না। রাতে ঘুমিয়েছে মায়ের বকুনি খেয়ে। ঘুমের মধ্যে দেখে কি- এক জায়গায় অনেক মানুষ। ভিড়ে হারিয়ে গেল বল্টুও। তারপর সে লক্ষ করল, দেয়ালের মতো একটা জিনিস। তাতে অনেক ছিদ্র। মানুষ সেইসব ছিদ্রে আঙুল দিয়ে কেউবা হাত ঢুকিয়ে ছিদ্রটাকে বড় করবার চেষ্টা করছে। বল্টু জানতে চাইল- কী হচ্ছে এসব? একজন তাকে বলল- এগুলো হচ্ছে মানুষের ভাগ্য। সবাই নিজ নিজ ভাগ্যটা বড় করার চেষ্টা করছে। যার ছিদ্রটা সবচে’ বড় হবে সেই ভবিষ্যতে হবে রাজা। উন্মাদের মতো ঝাপিয়ে পড়ল বল্টু। খুঁজে বের করল তার ভাগ্যের বিন্দুটা। প্রথমে আঙ্গুল তারপর পুরো হাত ঢুকিয়ে রাজার ভাগ্য নির্মাণে অস্থির হয়ে পড়ল। এদিকে নিয়মে আপোসহীন সদা নিরলস সূর্যমামা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেছে। বল্টু তার ঘুমে রাজকপাল নির্মাণে হস্তচালনায় চঞ্চল। সৎ মা তার ঘরে ঢুকে দেখেন- অভাগা নাদানটা তার শীতের একমাত্র সম্বল লেপখানার ছিদ্রে হাত ঢুকিয়ে ছিন্নভিন্ন করছে। রাগে ক্রোধে ‘রে হতচ্ছাড়া’ বলে পশ্চাতে পদাঘাত করে বসলেন। বল্টু এক লাফে উঠে বসে। ঠিক করতে পারে না, চোখ কচলাবে, না পশ্চাতে হাত বুলাবে! এই হলো ঘুমের স্বপ্ন।
এই তো কিছু দিন পূর্বে মারা গেলেন, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল কালাম। পৃথিবীর খ্যাতিমান বিজ্ঞানী এবং স্বপ্নজাগানিয়া প্রবাদপুরুষ। একবার বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেছেন- ‘মানুষ ঘুমে যে স্বপ্ন দেখে সেটা কোনো স্বপ্নই নয়। জেগে বসে সজাগ মস্তিষ্কে যে স্বপ্ন দেখে সেটাই স্বপ্ন।’ জীবনে যারা জেগে বসে স্বপ্ন দেখে- অতঃপর সেই স্বপ্ন পূরণে মুষ্ঠিবদ্ধ হতে পারে, হতে পারে স্বপ্ন জয়ে আপোসহীন সংগ্রামী- পৃথিবীতে তারাই একদা মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তাদের পরশে ধন্য হয় কাল। গর্ব করে পৃথিবী।
আবুল কালাম আজাদকে আমরা জানি। আমাদের ইতিহাসে তিনি ‘ইমামে ইনকিলাব।’ ভারত উপমহাদেশের রাজনীতি স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সাহিত্যবিপ্লবের তিনি তারকাতুল্য। উর্দু সাহিত্যে তিনি অম্লান প্রবাদ পুরুষ। আবুল কালাম- কথার রাজা। এই নামের স্বার্থক ছবি ছিল তার সমৃদ্ধ জীবন। গদ্য পদ্য তো বটেই- বক্তৃতায়ও তিনি ছিলেন তার কালের সম্রাট। কীভাবে নিজেকে দাঁড় করালেন তিনি সফলতার এই প্রবাদরেখায়? এর একটা সরল জবাব দিয়েছেন তার সহদোরা ফাতেমা বেগম! বলেছেন- আবুল কালাম তখন আট বছরের বালক। বাবার পাগড়ি মাথায় বেঁধে বোনদের বলতেন-
پیچھے ہٹو! دہلی کے مولانا آرہا ہیں، وہ دیکھو- وہ آگئے…
সরে দাঁড়াও তোমরা! দিল্লির মাওলানা আসছেন। দেখ দেখ- তিনি তো চলে এসেছেন …
তারপর ঘরের বাক্সের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করতেন। একটু থেমে বোনদেরকে বলতেন- ধরো, আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে অনেক লোক এসেছে। খানিক পরে আবার বলতেন- তোমরা সবাই আমার চারপাশে এসে দাঁড়াও। ‘জিন্দাবাদ’ বলে শ্লোগান দাও। বোনেরা প্রতিবাদ করে বলতো- এখানে তো আমরা তিন-চারজন মাত্র। হাজার হাজার মানুষ কোথায়? আজাদ বলত- এটা তো একটা খেলা। খেলায় অনেক কিছুই ধরে নিতে হয়! [মাওলানা আসলাম শায়খুপুরী, বড়োঁ কা বাচপান- ২৩৩ পৃ.] এ ছিল শিশু আজাদের স্বপ্ন! স্বপ্নের আকাশে নিজেকে এঁকেছিলেন দিল্লির বড় মাওলানা রূপে। এমন বড়- যাঁকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে মানুষের ঢল নামে। শ্লোগানে শ্লোগানে কম্পিত হয় আকাশ। এই স্বপ্ন আজাদকে কতটা উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল- আমরা তা জানি। সাগর সাগর রক্ত পেরিয়ে যখন স্বাধীন হলো ভারত তার সর্বপ্রথম শিক্ষামন্ত্রী হলেন মাওলানা আজাদ। আমাদের সাধারণ জনতা এবং রাজনীতিকদের চোখে এটাই আজাদের প্রতিষ্ঠার শীর্ষসিঁড়ি! অবশ্য যারা বিদ্বান এবং প্রতিষ্ঠার মর্মবাণী বুঝেন তাদের কাছে আজাদের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যখানে। আজাদ জন্মেছিলেন (১৮৮৮ঈ.) পবিত্র মক্কায়। আজাদের নানাবাড়ি প্রিয়নবীর প্রিয়শহর মদীনা মুনাওয়ারায়। আজাদের যথারীতি পড়াশোনার সূচনা হয়েছিল মক্কা মুকাররমার পবিত্র হেরেমে। তখন তাঁর বয়স পাঁচ বছর। [বড়োঁ কা বাচপান : ২২১] তারপর ক্রমাগত সাধনা এবং আল্লাহপ্রদত্ত অনন্য প্রতিভা বলে আজাদ উদিত হয়েছিলেন আমাদের আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে। নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন উর্দুসাহিত্য- সবিশেষ উর্দুসাংবাদিকতার প্রবাদ পুরুষরূপে।
১৯২৯ সাল। আজাদ তখন বত্রিশ বছরের যুবক। প্রকাশ করলেন উর্দু সাংবাদিকতার ধূমকেতু সাপ্তাহিক ‘আলহেলাল’। সম্পাদক আজাদ নিজে। প্রথম সংখ্যায় জানিয়ে ছিলেন-
وہ اعلی پایاۓ کاایک ایسا ہفت روزہ چاہتے ہیں، جس میں جلال وجمال کا امتزاج ہو
‘এমন একটি উঁচু মাপের সাপ্তাহিক চাই- যাতে সমন্বয় ঘটবে প্রীতি ও ভীতির।’
নিশ্ছিদ্র মনযোগ আর সাধনার দহিত শক্তি অল্প সময়ে আলহেলালকে দান করলো কালের শ্রেষ্ঠ কাগজের মর্যাদা। প্রচারসংখ্যা দাঁড়ালো পঁচিশ হাজারেরও বেশি। গাঁয়ের লোকেরা এতটাই হেলালভক্ত হয়ে পড়েছিল- তারা হেলালপাঠের চক্র তৈরি করে বসত। একজন পড়ত। একদল শুনত। [মুফতী এ’জাজ আরশাদ কাসেমী, মান শাহে জাহানাম-৩০৭] এই আলহেলালের ভেতর দিয়ে তার আত্মায় লালিত স্বধর্ম স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি প্রেম ও প্রীতি যেমন ছড়িয়ে ছিলেন প্রাণ উজাড় করে তেমনি বিদেশী ব্রিটিশ বেঈমান এবং স্বদেশী দালালদের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবের ভীতি ও লেলিহান। পরিণতিতে সিক্ত হয়েছেন দেশ ও জাতির অপার শ্রদ্ধা ভালোবাসায় এবং দগ্ধ হয়েছেন জিন্দানখানার অনলে! এই আমাদের বড়দের যাপিত ইতিহাস!
স্বপ্ন ও সাধনাই প্রতিষ্ঠার ইসমে আজম। আজাদ স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার জন্য পথে নেমেছিলেন। নিজেকে পুড়িয়েছিলেন সাধনার অনলে। আর মাত্র পনের বছর বয়সে সম্পাদক হয়েছিলেন এবং নিজে ‘লিসানুসসিদক’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সমকালীন বিখ্যাত উর্দু কবি ‘হালী’ ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন এই পত্রিকার। ১৯০৪ সালে যখন আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম লাহোরের বার্ষিক সভায় তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়- হালী বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না- ষোল বছরের এই বালক লিসানুসসিদক এর সম্পাদক। এই সময়ে দেখা হয় সমকালীন খ্যতিমান চিন্তাবিদ আল্লামা শিবলীর সঙ্গে। শিবলী এই দাড়িহীন বালককে মনে করেন- আবুল কালাম আজাদের পুত্র! [শায়েখ মুহাম্মদ একরাম, মওজে কাওসার-২৫১পৃ.] এক আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে বুকে ধরে কলম তুলে নিয়েছিলেন এক রকমের শিশু আজাদ। কবিতায় হাত দেন মাত্র দশ বছর বয়সে। ছদ্মনাম ধারণ করে ‘আজাদ’। বশ করেন ভাষার রাজ্য। তারপর ভাষার গায়ে ছড়িয়ে দেন বিপ্লবের আগুন। আমাদের ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন ইমামে ইনকিলাব- স্বাধীনতা আন্দোলনের আপসহীন নেতারূপে! অবশ্য ভাষা সাহিত্য দর্শন ও ধর্মচিন্তায়ও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাযকেরা, গোবারে খাতের, তারীখে আযীমত ওয়া দাওয়াত, তরজমানুল কুরআন, আসহাবে কাহ্ফ, ইনসানিয়্যাত মওত কে দরওয়াযে পর প্রভৃতি রচনা তার অনন্য প্রতিভার জীবন্ত সাক্ষী।
***
এই আলমাহমুদের কথা বলি। সোনালী কাবিনের কবি। উভয় বাঙলার কবিতাপ্রেমীদের প্রিয়মুখ। আমি তো বার বার নাইয়ে তৃপ্ত হয়েছি তার কবিতার বর্ণনায় এবং গদ্যের তিতাসে। তার ভাষায়- পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে আমি একটা টিনের সুটকেস নিয়ে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে এসে নামলাম। সম্ভবত সেটা ছিল শীতকাল। সন্দেহ নেই আমি কবি হওয়ার প্রতিভা নিয়ে এই প্রাচীন মোগলাই শহরে পা রেখেছিলাম।… …
…পথচারী আমাকে বলল- ওই তো সামনে নবাবপুর রোডের মাথা। ডান দিকে গেলেই নবাবপুর চলে যাবেন। আমি সুটকেসটি হাতে তুলে হাঁটতে শুরু করলাম। সুটকেসটি আমার হালকাই ছিল। কিছু কবিতার জীর্ণ খাতা, একটি বই আর কিছু কাপড়। সে সময় আমি সবে হাফপ্যান্ট ছেড়ে পাজামা পরতে শুরু করেছি। আমার পরনে ছিল কুমিল্লার খদ্দরের মোটা হলুদ পাঞ্জাবি। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল! [আলমাহমুদ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ-৭ পৃ.] যুবক যখন স্বপ্নে শপথে প্রতিজ্ঞায় মুষ্ঠিবদ্ধ হয় পৃথিবী মুগ্ধ হয় তার প্রতিষ্ঠায়। আলমাহমুদের জীবনে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে এবং দুটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ- লোক লোকান্তর ও কালের কলস- এর জন্য ১৯৬৮ সনে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। তার কবিতায় এবং গদ্যে ভাষার সারল্য বয়নের সূ²তা এবং উপমার বনেদি ঘ্রাণ পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল- আপনি কার মতো লেখতে চেয়েছিলেন?
বলেছিলেন : আমি হুমায়ুন কবীরের মতো মর্যাদাশীল গদ্যও লেখতে চাইনি; জসীম উদ্দীনের মতো মিষ্টি গদ্যও লেখতে চাইনি। আমি চেয়েছি, আলমাহমুদের মতো লেখতে। সম্ভবত সেটা আমি পেরেছি!
হ্যাঁ আলমাহমুদ সেটা পেরেছেন। একথা এখন শত্রু-মিত্র সকলেই স্বীকার করেন। তবুও আলমাহমুদ যে শুধু নিজেকে উঁচু করেন নি। উঁচু করেছেন আমাদের ভাষা ও দেশকে তার একটা দলিল দিই। আলমাহমুদ কলকাতায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন ‘সমান্তরাল’ বলে একটি আবৃত্তি সংগঠনের পক্ষ থেকে। ফিরে এসে লিখেছেন- … পরের দিন রোটারি সদনে বিপুল আয়োজনের মধ্যে আমি আবৃত্তি সম্মেলন উদ্বোধন করলাম। যেখানে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়সহ বেশ ক’জন খ্যাতনামা ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আমি অকপটে বাংলাদেশের কবিতা, কথাশিল্প ও নাট্যকলার নানা প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বোঝাতে চাইলাম- ঢাকাই আধুনিক বাংলা ভাষার রাজধানী। প্রসঙ্গক্রমে এ দাবিও তুললাম- ঢাকাইয়া আবৃত্তিরও একটা স্বতন্ত্র ঢঙ আছে। আমাদের আবৃত্তি চর্চার কয়েকটা বৈশিষ্ট্যের কথা বললাম এবং একথাও বললাম- রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তির ঢঙটি একেবারে খড়খড়ে পশ্চিমবঙ্গীয় ছিল না। তাতে পূর্ববঙ্গীয় টান ধরা পড়ে যায়।… সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী বক্তা হিসাবে আমার বক্তব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং স্বীকার করলেন- ঢাকাই আধুনিক বাংলা ভাষার রাজধানী! [কবির সৃজনবেদনা, প্রবন্ধের নাম : এই তো কলকাতা- পৃ.২৫] আলমাহমুদ এরপর লিখেছেন- রাতে হোটেলে ফিরলে সহসা ভাস্কর এসে জানালেন- সমান্তরাল আমাকে একটি সম্মাননা পদক প্রদান করে রবীন্দ্র সদনে আমাকে সংবর্ধিত করবে। আমি তো অবাক। ভাষ্কর জানালেন, ভানুসিংহ পদক সাধারণত সমান্তরালের পক্ষ থেকে দেয়া হয় কিন্তু অনুষ্ঠানটি হয় শান্তি নিকেতনে। এবার যেহেতু তারা আমাকে মনোনীত করেছে এদিকে শান্তি নিকেতনে যাওয়ার মতো সময় আমার নেই। সেই কারণে কলকাতাতেই উৎসব করে দেয়া হবে এবং স্থান রবীন্দ্র সদন। সন্দেহ নেই, এতে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। কারণ আমি জানতাম- আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু একবার এলবার্টহলে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো মুসলমান কবিকে পশ্চিম বাংলার লেখক-বুদ্ধিজীবিগণ প্রকাশ্যে কোনো সম্মান প্রদর্শন করেন নি। যদিও আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহু সাহিত্যপুরস্কার পেয়েছি এবং গ্রহণ করেছি!
পরের দিন ছিল ছুটির দিন। সে দিন কবি আলমাহমুদ তার ভানুসিংহ পদক-প্রাপ্তির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন- … অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠানটি শুরু হল। আমার পরিচিতি এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন কলকাতার জীবনের বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে বক্তৃতা করলেন আমার বিশিষ্ট বন্ধু কথাশিল্পী সন্দীপন চট্টোপধ্যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমার সোনালী কাবিনের চৌদ্দটি সনেট নিয়ে একটি মিনিবুক বের করেছিলেন। তিনি সেসব কথা বললেন। আমার হাতে পদক তুলে দিলেন দেবদুলাল বন্দোপধ্যায়। আমি খুব অভিভূত অবস্থায় পদকটি গ্রহণ করে দু চার কথা বললাম। … আমি মঞ্চ ছেড়ে দর্শকদের মধ্যে আসন গ্রহণ করলাম এবং দেখলাম, সেখানে আমাদের বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনসুর মুসা বসে আছেন। তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন- আপনার বিজয় উৎসব দেখতে এসেছি। [ঐ- ২৬-২৭ পৃ.] আলমাহমুদ টুপি পরে মানুষ হয়ে গেছেন বলে যারা তার কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিতে চায়, অস্বীকার করতে চায় তার অভ্যস্ত সৃজনশীলতাকে- মনসুর মুসার কথায় তার নাকভাঙ্গা উত্তর আছে। আর নজরুলের পরে পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে সংবর্ধিত হওয়া এবং সেখানে সাহিত্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে ঢাকাকে আধুনিক বাংলাভাষার রাজধানী বলাতে আছে আলমাহমুদের উচ্চতার দ্যুতি।
কবির কথা যখন এলো একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিই। সোনালী কাবিন নয়। কবিতার নাম ‘মানুষের আদি অভ্যাস’-
মানুষের আদি অভ্যাস হলো
সুদিনের জন্যে বসে থাকা।
বউয়ের ক্লান্ত চুড়িভরা হাত
হাঁড়িকুড়ি, ধূমায়িত ভাতের থালার পাশ দিয়ে
কখন বাড়ির চেনা বেড়ালের মতো
সুদিন আসবে।
প্রাত্যহিক দিন যাপন
সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা
বুড়িগঙ্গার লঞ্চ আর
দ্রুতগামী রেলগাড়ি
আমাদের জন্য প্রত্যেক দিন
সুদিনের বদলে নিয়ে আসে দুর্ঘটনা।
প্রত্যেক দিন অফিসে গিয়ে দেখি
সবচেয়ে সহৃদয় ব্যক্তি
যে হরিণের চামড়াটি পরতে ভালোবাসতেন
ভেতরের গরমে তাতে পচন ধরায়
এখন চিতার চক্করসহ তিনি হাঁসফাঁস করছেন।
তারপর জগতের সবচেয়ে নিরহঙ্কার
একটি বিষয়ের দিকে আমার চোখ পড়ল-
মোঘল যুগের একটি পুরনো মসজিদের
গগনভেদী মিনারের দিকে।
মিনারটি বিশাল আর আকাশ ফুঁড়ে
অসীমের দিকে উঠে গেছে।
প্রত্যেক দিন একটা ছোট্ট মানুষ
সিঁড়ি ভেঙ্গে তার চূড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়
আর মানুষের সন্ততিদের
মঙ্গলের দিকে ডাকে
[আলমাহমুদ, শ্রেষ্ঠ কবিতা- আদর্শ :৮৩ ] আলমাহমুদ তার কবিতায় বড় হয়ে উঠেছেন এইভাবে। আমাদের মিনারের ধ্বনির সঙ্গে যার কবিতার সুর মিশে যায় সে আর হারায় না। অবশ্য এই চূড়াটা জয় করার জন্যে চাই স্বপ্ন ও প্রতিভা। সব যুগের সব আজাদ ও মাহ্মুদ স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞার ডানায় চড়েই ছুঁয়েছেন ওই চূড়ার মাটি!
***
বড় হতে হলে স্বপ্ন দেখতেই হয়। প্রতিজ্ঞা করতে হয় স্বপ্নটা হাতের মুঠোয় করে দেখবার। একদা আমাদের পাঠ্যপুস্তকেও ছিল এই স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞার পাঠ। তালীমুল মুতায়াল্লিম- আল্লামা বুরহানুদ্দীন যারনুজী রহ. লিখিত একখানা চমৎকার গ্রন্থ। বুরহানুদ্দীন যারনুজীর বড় পরিচয় তিনি অমরগ্রন্থ হেদায়ার রচয়িতা আল্লামা বুরহানুদ্দীন আলী রহ. এর তারকাশিষ্য। হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর বরিত মনীষী। যুগ যুগ ধরে পাঠ্য এই গ্রন্থে যে সকল সোনাঝরা উপদেশ তিনি দিয়েছেন তন্মধ্যে একটি বড় উপদেশ হলো স্বপ্ন ও সাহস। তাঁর ভাষায় হিম্মত! তিনি লিখেছেন-
فمن كانت همته حفظ جميع كتب محمد بن الحسن واقترن بذلك الجد والمواظبة فالظاهر أنه يحفظ أكثرها أونصفها
‘যার স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা হবে- আমি ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর সবগুলো গ্রন্থ মুখস্থ করে ফেলব অতঃপর সে জন্যে বরাবর চেষ্টা ও সাধনা করবে সে সবগুলো না হলেও অধিকাংশ কিংবা অর্ধেক রচনাবলি তো আত্মস্থ করেই ছাড়বে।’ [তালীমুল মুতায়াল্লিম- ৮৮ পৃ.] এটাও প্রতিজ্ঞায় সাধক হওয়ার এক পরীক্ষিত মন্ত্র। যার স্বপ্ন যতটা উঁচু হয় তার প্রতিষ্ঠাও হয় ততটা বিরাট। বলেছেন, ইমাম মুহাম্মদের ‘সকলগ্রন্থ’ আত্মস্থ করার প্রতিজ্ঞায় যদি মগ্ন সাধক হতে পার তাহলে তার বেশির ভাগ আর কম করে হলেও অর্ধেক ঠাঁই করে নিবে তোমার আত্মার আকাশে! অতঃপর তুমি হবে তোমার কালের মুহাম্মদ কিংবা ছোট মুহাম্মদ!
আমরা ভুলতে পারি না- ইমাম মুহাম্মদ ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ছাত্র। ইমাম আবু হানীফা রহ. ওফাত লাভ করেছেন ১৫০হিজরিতে। ইমাম মুহাম্মদ রহ. জন্মলাভ করেছেন হিজরি ১৩২ সালে। তিনি যখন জীবনের অষ্টাদশ বসন্তে তখন ওফাত লাভ করেন তাঁর প্রিয়তম উস্তাদ, মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম জ্ঞানের আকাশে পৃথিবী আলোকরা পূর্ণিমার চাঁদ আবু হানীফা রহ.। কাছে থেকে দেখেছেন তাঁকে। অতঃপর গড়ে উঠেছেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এবং পরে ইমাম মালিক রহ. এর সান্নিধ্যে। বড় মানুষের সান্নিধ্য তাকে কতটা বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিল আমরা জানি না। তবে জানি তিনি অনেক বড় হয়েছিলেন। কত বড় হয়েছিলেন তার উপমা দিই! ইমাম মুহাম্মদ রহ. লিখিত একটি গ্রন্থ ‘আলমাবসূত’। গল্পটি এই গ্রন্থের। আল্লামা যাহেদ কাওসারীর ভাষায়-
وأسلم حكيم من أهل الكتاب بسبب مطالعة المبسوط هذا قائلا : هذا كتاب محمدكم الأصغر فكيف كتاب محمدكم الأكبر.
এক ইহুদি পণ্ডিত ইমাম মুহাম্মদের মাবসূত পড়ার পর এই বলে ইসলাম গ্রহণ করেন- এটা তোমাদের ছোট মুহাম্মদের কিতাব, তাহলে তোমাদের বড় মুহাম্মদের কিতাব কেমন হবে? [আল্লামা যাহেদ কাওসারী, বুলুগুল আমানী ফী সীরাতিল ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ্শায়বানী, মাকতাবাতুল হাসান : ১৯৬ পৃ.] ছয় খণ্ডে সমাপ্ত। প্রতি খণ্ড পাঁচশ পৃষ্ঠা প্রায়। জগতময় এর নাম। ইমাম মুহাম্মদ রহ. রচিত আরেকটি কিতাব- ‘আলজামিউল কাবীর।’ মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবন শুজা এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন-
مثل محمد بن الحسن في الجامع الكبير كرجل بنى دارا. فكأنما على بنى مرقاة يرقى منها الى ما علاه من الدار، حتى استتم بناءها كذلك. ثم نزل عنها وهدم مراقيها، ثم قال للناس : شأنكم فاصعدوا.
‘আলজামিউল কাবীর’ আর ইমাম মুহাম্মদের উপমা হলো সেই ব্যক্তির মতো যে ব্যক্তি বাড়ি বানিয়েছে। একতলা পূর্ণ হওয়ার পর উপরে ওঠার জন্যে একটি সিঁড়ি বানিয়েছে। এভাবে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নিচে নেমে সবগুলো সিঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। তারপর মানুষকে বলেছে- এবার পারলে উপরে ওঠো! [আল্লামা যাহাবী, মানাকিবুল ইমাম আবি হানীফা ওয়া সাহিবাইহি- ৭৬ পৃ.] অর্থাৎ এই রচনার উচ্চতা স্পর্শ করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। রচনার উচ্চতা সে তো রচয়িতারই উচ্চতা। এই উচ্চতার আরেকটি উদাহরণ দিই। আবূ উবাইদ বলেন- আমরা বসে আছি ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের সঙ্গে। এরই মধ্যে আগমন করলেন হারুনুর রশীদ। হেঁটে গেলেন মজলিসের সামনে দিয়ে। খলীফাকে দেখামাত্র সকলেই উঠে দাঁড়াল কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ অচঞ্চল তাঁর আসনে। কিছুক্ষণ পর প্রতাপতেজী এই সম্রাট ডেকে পাঠালেন উম্মাহর এই বরিত ইমামকে। ভয়ে সকলের রক্ত হিম। কিন্তু ইমামের বদন অমলিন। আগমন করলেন সম্রাটের দরবারে। ফিরে এলেন খানিক পরেই। সকলের মুখেই অবাক প্রশ্ন! ইমাম নিজেই বললেন- খলীফা আমাকে প্রশ্ন করেছেন- সকলের সঙ্গে আপনি দাঁড়ালেন না কেন? বললাম- আপনি আমাকে যে দলে রেখেছেন তাদের থেকে বেরিয়ে অন্য কোন দলে চলে যাওয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। আপনি আমাকে আলেমসমাজে রেখেছেন। তাই আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে আপনার সেবক ও চাকর সমাজে ঢুকিনি। তাছাড়া এও বলেছি- হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি মানুষ তার সম্মানে দাঁড়াক এই কামনা করে- সে যেন দোজখে তার নিবাস ধরে নেয়।’ হারুনুর রশীদ আমার কথা মনোযোগসহ শুনেছেন। তারপর বলেছেন- !صدقت يا محمد
মুহাম্মদ! আপনি সত্য বলেছেন। [মাওলানা আবদুল কাইউম হাক্কানী, দেফায়ে ইমাম আবূ হানীফা : ১৮০] এই হলো আমাদের বড় মানুষ ইমাম মুহাম্মদ রহ.। ইমাম মুহাম্মদের গ্রন্থাবলির নাম করে আল্লামা যারনুজী রহ. হয়তো উম্মাহর ভবিষ্যতকর্ণধার আমাদের শিক্ষার্থী কিশোর ও তরুণদের অন্তরে বড় হওয়ার এই স্বপ্নকেই প্রোথিত করতে চেয়েছেন! এটা অভিজ্ঞতায় দগ্ধসত্য- মানুষের জীবনে অর্জন ও সফলতা স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞার অনুপাতেই হয়ে থাকে!
আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিই- এই স্বপ্নের মূল্য অন্তহীন। মুহাদ্দিস ঈসা ইবনে ইউনুস। সিহাহসিত্তার রাবী। ইমাম মালিক ও ইমাম আওযাঈর যোগ্য ছাত্র। ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়াইহ্ এর মতো মনীষী তাঁর ছাত্র। বাদশা হারুনুর রশীদ যখন হজে আসেন তখন ইমাম আবূ ইউসুফ রহ.কে বলেন, সকল মুহাদ্দিস যেন বাদশার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বাদশার ফরমান পৌঁছে যায় সকলের কাছে। তখন মুহদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস আর ঈসা ইবনে ইউনুস ছাড়া সকলেই হাজির হন বাদশার দরবারে। বিষয়টি জানার পর বাদশা হারুনুর রশীদ পুত্র মামুন ও আমীনকে আদেশ করেন ঈসা ইবনে ইউনুসের কাছে গিয়ে হাদীস পড়ে আসতে। পুত্রদ্বয় ছুটে যান হযরত ঈসার দরবারে। নিয়ে আসেন হাদীসের পাঠ। বাদশা তখন হযরত ঈসার জন্যে একহাজার দেরহাম উপহার পাঠাতে বলেন। শায়েখ ঈসা তা প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফার লোকেরা ভেবেছেন- কম বলে ফেরত পাঠিয়েছেন। পুনরায় দ্বিগুণ অর্থ পাঠিয়ে দেন। তখন হযরত ঈসা ইবনে ইউনুস বলেন-
ان ملأتم المسجد الى السقف ذهبا لم آخذ شيئا على الحديث
‘যদি স্বর্ণ দিয়ে মসজিদের ছাদ অবধি পূর্ণ করে দাও তবুও হাদীসের বিনিময়ে একটি কড়িও নেব না।’
কারণ- নবীজির রেখে যাওয়া এই ধনের কোনো মূল্য হয় না। হযরত ঈসা এক বছর হজে যেতেন। পরের বছর যেতেন জিহাদে। এভাবে জীবনে পঁয়তাল্লিশ বার হজ করেছেন জিহাদ করেছেন পঁয়তাল্লিশ বার। বলি স্বপ্ন যখন দেখবেই ঈসা ইবনে ইউনুস হওয়ার স্বপ্ন দেখ! [ মোল্লা আলী কারী, জমউশ শামাইল, মাকতাবা আশরাফিয়া, দেওবন্দ- ২৯ পৃ.] [চলবে- বিইযনিল্লাহ…]
(৩য় কিস্তি)
সিদ্ধান্তটা নিতে হবে নিজেকেই
মাওলানা মনযুর নোমানী রহ.-এই উপমহাদেশের তারকাপুরুষ। সুবিখ্যাত মাসিক পত্রিকা আলফুরকানের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। মাআরিফুল হাদীস, ইরানী ইনকিলাব, দীন ওয়া শরীয়ত, ইসলাম কিয়া হ্যায় ও মাওলানা মওদুদী কে সাথ মেরি রেফাকাত কী সারগুজাস্তসহ অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থের কলোত্তীর্ণ লেখক। শক্তিমান তার্কিক, দুঃসাহসী সাংবাদিক এবং দরদী দাঈ এই মনীষী দারুল উলূম দেওবন্দের অনন্য কৃতিসন্তান।
আমাদের প্রিয় শিক্ষক বর্তমান মুসলিম বিশ্বের খ্যাতিমান আরবী লেখক মাওলানা নূর আলম খলীল আমিনী সম্পর্কে একটা কথা চালু আছে-তিনি কারও প্রশংসা করতে জানেন না। অথচ তিনিই আমাদের ক্লাসে বলেছেন-`এখন যদি সত্যিকারে জীবিত কোনো দেওবন্দি আলেম দেখতে চাও তাহলে মাওলানা মনযুর নোমানীকে দেখে এসো। জীবিতদের মধ্যে সত্যিকারের দেওবন্দি আলেমের তিনিই একমাত্র নমুনা।’ আমরা অবাক হয়েছি। আমার বন্ধুরা দেওবন্দ থেকে লখনৌ গিয়েছেন তাঁকে একনজর দেখার জন্যে। আমার সৌভাগ্য-আমি খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি। দোয়া নিয়েছি। আমাকে এবং বন্ধু মাওলানা রুহুল আমীন কাসেমী (উসতাদ, মাদরাসাতুস সাহাবা ঢাকা) সাহেবকে পাঁচ রুপি করে হাদিয়াও দিয়েছিলেন।
দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার মাত্র আঠার বছর পর দারুল উলূমের মজলিসে শূরার সদস্য নির্বাচিত হন। ছিলেন রাবেতাতুল আলামিল ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। যে কথা বলতে চাই তাহলো কীর্তি অবদান খ্যাতি স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতার এই উচ্চ আসনে পৌঁছলেন কীভাবে-সেই রহস্য! শূন্য থেকে এই অসামান্য অধিষ্ঠানের রহস্য উন্মোচন করেছেন তিনি নিজেই।
হিজরী ১৩৯০ সালের কথা। দুই দিনের সফরে দেওবন্দ আগমন করেন। তখন তাঁর জীবনের পড়ন্ত প্রহর। একদিন বাদ আসর, ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। হৃদয়জাত সেই বক্তৃতায় তুলে ধরেন তার যাপিত জীবনের এক স্বর্ণপ্রসবিনী বাঁকের গল্প। বলেন-‘আপনারা জানেন, আমি উত্তর প্রদেশের সামভালের মানুষ। আমার বাবা ছিলেন একজন বিত্তবান এবং সম্ভ্রান্ত মানুষ। দীনদারিও ছিল গভীর। সুফীসাধকদের সাধনা করেছেন একান্ত একাগ্রতায়। মানুষ তাকে ‘সুফীজি’ বলে ডাকত। আখেরাতের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। তাই তিনি বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও সন্তানদের বিলেতি শিক্ষাদানকে বৈধ মনে করতেন না। তার এই বিশ্বাসের টানেই আমাকে কোরআন শরীফ নাজেরা এবং সামান্য উর্দু ফার্সী পড়ার পর আরবী শাখায় ভর্তি করে দেন! অথচ আমার তখন মীযান মুনশাইব পাঞ্জেগাঞ্জ নাহবেমীর-এক কথায় সরফ ও নাহুর বৈকারণিক ভাঁজ বুঝবার বয়স হয়নি। আর বিশেষ করে এই কারণেও ওসবের অ আ কিছুই বুঝতাম না-এই শিক্ষার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল না। মন পড়ে থাকত কোথাও আর আমি কিতাবের সামনে। বেতের ভয়ে উপস্থিত হয় তো মুখস্থ করে শুনিয়ে দিতাম। কিন্তু বোঝা হতো না কিছুই। মনে পড়ে কয়েক বছর আমার এভাবে কেটে যায়।
আমাদের সামভালে তখন তিনটি মাদরাসা ছিল। বছর শেষে আমার বাবা যখন অনুমান করতেন আমার পড়াশোনা ঠিক মতো হচ্ছে না-পরের বছর অন্য মাদরাসায় ভর্তি করতেন। নতুন মাদরাসায় যাওয়ার পর সেখানকার শিক্ষকগণ যখন দেখতেন আমি কিছুই পারি না তখন আবার সেই আগের ক্লাসে পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে বছর বছর মাদরাসা বদলাতে থাকি আর প্রতি বছরই আমার পাঠ শুরু হতো-
بداں اسعدک اللہ تعالی في الدارین -মীযান শরীফের শুভসূচনা …
এভাবে দুই তিন বছর কেটে যায় আমার। আমার বয়স তখন প্রায় বার বছর। এই সময় ঘটল একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। আমাদের মুরাদাবাদ জেলার ইংরেজ কালেক্টর। আমার বাবার ভক্ত। আমার বাবার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করে যখন জানতে পারলেন-তার সন্তানদের কেউই আধুনিক এবং বিলেতি পড়াশোনা করে না-তখন তিনি অবাক হলেন। আমার পড়াশোনার খোঁজখবর নেয়ার পর বাবাকে অনুরোধ করলেন-আমাকে যেন দ্রুত স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বললেন-আমি হেড মাস্টারকে বলে দেব, পাঁচ বছরে একে এন্টার্স করিয়ে দেবে। তারপর তাকে নায়েবে তহসিলদারের চাকরি দিয়ে দেব। সেকালে ভারত উপমহাদেশে ‘নায়েবে তহসিলদার’ ছিল খুবই মূল্যবান জিনিস। সেখান থেকে প্রথমে প্রমোশন হতো তহসিলদার হিসাবে। তারপর ডেপুটি কালেক্টর। ভারতীয়দের জন্যে এটাই ছিল চাকরি ও অর্জনের স্বর্গ। তারপর কালেক্টর এবং কমিশনার হতো ইংরেজ।
আমার বাবা ঘরের স্বজন এবং বাইরের শুভাকাক্সক্ষীদের সুপারিশসহ এই অনুরোধকে উড়িয়ে দেন। তার সোজা জবাব-আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমার পূর্ণ বিশ্বাস, এ জীবনে সন্তানদের থেকে আমাকে কিছু নিতে হবে না। আমি তাদেরকে খাওয়াব, পরাব, যখন যা প্রয়োজন দিতে থাকব। তবে মৃত্যুর পর ওদের কাছে আমার ঠেকা আছে। তাই তাদেরকে এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করব যেন কবরে এবং তার পরে তাদের থেকে আমি কিছু পাই!
আমার ছিল খেলার নেশা। ক্রিকেট খেলা ছিল আমার প্রিয় বিষয়। ভাবতাম, বাবা যদি এই ইংরেজ ভদ্রলোকের কথাটা শুনতেন আমি লেখাপড়া করে প্রথমে নায়েবে তহসিলদার, তারপর তহসিলদার এবং অবশেষে ডেপুটি কালেক্টর হয়ে যেতে পারতাম। আর কিছু না হোক স্বাধীনভাবে ক্রিকেট তো খেলতে পারতাম। অন্তত ক্রিকেট খেলার জন্যে রোজ রোজ মার খেতে হতো না!
***
তারপর এলো ১৩৩৮ হি. সাল। আমার বয়স তখন পনের। আমার বাবা জানতে পারলেন অমুক মাদরাসায় একজন পাঞ্জাবি শিক্ষক এসেছেন। খুবই মনযোগী শিক্ষক। বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন-আমাকে তার কাছে পাঠাবেন। তাঁর নাম মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ নাঈম লুধিয়ানভী রহ.। বাবার এক বন্ধুর পত্রসহ গেলাম তার কাছে। কতদিন ধরে মাদরাসায় পড়ছি, কী পড়ছি ইত্যাদি বিষয়ে আমাকে নানা প্রশ্ন করার পর তিনি বুঝতে পারলেন, আমি মেধায় দুর্বল নই। এও বুঝলেন-আসলে মন থেকে আমি পড়ছি না বলেই এতটা সময় বরবাদ করে এসেছি। আমাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আমিও স্বীকার করি-হ্যাঁ, বিষয়টা তা-ই। তখন তিনি একান্ত দরদ ¯েœহ ও সরল কণ্ঠে বললেন : ভাই, তুমিই সিদ্ধান্ত নাও আসলে তুমি পড়তে চাও কি না। যদি পড়তে না চাও প্রয়োজনে আমি তোমার বাবার কাছে যাব। তাকে বলব, তিনি যেন তোমাকে অন্য কোনো পথে দেন। এভাবে তোমার সময় যেন আর নষ্ট না করেন। আর যদি বল পড়বে তাহলে আমরা তোমাকে পড়াব। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত তুমি অনেক পড়ে ফেলবে। মেহেরবান আল্লাহ আমার অন্তরে আলো ছড়িয়ে দিলেন। আমি বললাম : ইনশাআল্লাহ আমি পড়ব। তারপর তিনি আমাকে পড়াতে শুরু করলেন। বছরের মধ্যখানে তার কাছে গিয়েছিলাম। বছরের শেষ অবধি তিনি আমাকে মীযান থেকে হেদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত পড়িয়ে দেন। পড়ায় মন বসে। আমি এবার পড়তে থাকি। [মাওলানা মনযুর নোমানী, মুনতাখাব তাকরীরেঁ, ১৬৫-১৬৯ পৃ.; ঐ, তাহদীসে নেয়ামত, ২৪-২৫ পৃ.] তারপর প্রায় পাঁচ বছর মীযানপড়া এই মনযুর নোমানী কোথায় পৌঁছালেন-সে এক অবাক কাণ্ড। দারুল উলূম দেওবন্দে এসে শিষ্য হয়েছেন সমকালীন বুখারী আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরী রহ. এর। দাওরায়ে হাদীসের বার্ষিক পরীক্ষায় বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফের প্রশ্নাবলির উত্তর লিখতে গিয়ে আবেদন করেছেন-মাদরাসার পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। আমাকে সময় বাড়িয়ে দেয়া হোক। সকাল থেকে আসর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাঁর ভাষায়-
ہر سوال کے جواب میں میں ایک رسالہ لکھا اور اسکا نام رکھ دیا
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে একটি পুস্তিকা লেখি এবং তার নামও রাখি। [মাওলানা মনযুর নোমানী, তাহদীসে নেয়ামত : ৩০ পৃ.] তিনি এখন আমাদের বরিত ইতিহাসের স্তম্ভ পুরুষ। হযরত কাশমিরী রহ. এর তারকাশিষ্য, দারুল উলূম দেওবন্দের স্বর্ণসন্তান এবং ভারতের মুসলমানদের শিক্ষা সভ্যতা ও গৌরবময় অস্তিত্ব রক্ষায় পরীক্ষিত দিশারী।
***
মাওলানা নোমানী কতটা উচ্চতায় বরিত হয়েছিলেন তার একটা ইঙ্গিত আমরা দিতে চেষ্টা করেছি। গ্রহণযোগ্যতা কতটা লাভ করেছিলেন তার একটি ক্ষুদ্র উপমা দিই। ‘শাইখুল হাদীস’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই এই উপমহাদেশের মুসলমানদের মানসরাজ্যে যে নামটি পূর্ণিমার মতো জোছনা ছড়াতে থাকে তিনি হলেন মাওলানা যাকারিয়া রহ.। ঘটনাটি তার দরবারের। মাওলানা মনযুর নোমানীর ভাষায়-‘কোনো এককালে চিকিৎসকের পরামর্শে খাওয়ার পর দুই তোলা পরিমাণে গুড় খেতে শুরু করি। হযরত শায়েখ (শাইখুল হাদীস রহ.) বিষয়টি কোনোভাবে জানতে পারেন। তারপর থেকে যখনই হযরত শায়খের দরবারে গিয়েছি অবশ্যই ঘর থেকে আমার জন্যে গুড় পাঠানো হয়েছে, সেই সঙ্গে উন্নতমানের দেশি ঘি।
একবারের ঘটনা। হযরত শায়েখ তখন মদীনা শরীফে থাকেন। হযরতের দরবারে গেলাম। হযরত যত দিন মদীনায় ছিলেন তার রুটিন ছিল-শুধু রাতে এশার পর খানা খেতেন। দিনে কিছু খেতেন না। হয়তো এই কারণেই-মদীনায় অবস্থানকালে খুব রোযা রাখতেন। যা-ই হোক, মদীনা মুনাওয়ারায় গিয়ে হযরত শায়খের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেই বললেন : যতদিন মদীনায় থাকবে রাতের খাবার আমার সঙ্গেই খাবে। দিনের বেলায় তুমি স্বাধীন। আদেশ মাফিক এশার পর যথাসময়ে হাজির হলাম। আমাকে দেখেই খাদেমকে ডাকলেন। বললেন-পাকিস্তানের এক লোক গুড় হাদিয়া দিয়ে গিয়েছিল। রেখে দিতে বলেছিলাম। তারপর আমার নাম নিয়ে বললেন-এই যে চলে এসেছে। এর জন্যেই গুড় রেখে দিতে বলেছিলাম। হাজির করা হলো পাকিস্তানি গুড়। এই অধম যত দিন মদীনা মুনাওয়ারায় ছিল প্রতিদিন নিয়মিত খাওয়ার সময় গুড়ও হাজির থাকত।’ [ঐ-২৯৭-২৯৮ পৃ.] কতটা শক্তিমান ছিল বাঁধন আর কতটা যতনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন হৃদয়ে। তবে এখানে যে কথা বলতে চাই তাহলো-এই আসনে সমাসীন হওয়ার জন্যে মাওলনা মনযুর নোমানীকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল-আমি ইনশাল্লাহ পড়ব-আর সেটা তাঁর ছাত্রজীবনে।
কুকুর ও শেয়ালের গল্প
লোককথার বিখ্যাত গল্প। মহল্লার সবচে’ শক্তিমান কুকুরটিকে ঘিরে বসে আছে একদল কুকুর। অলস গল্প হচ্ছে। একটি কুকুর বলল-আচ্ছা বস! আপনার গায়ে এত শক্তি আমরা কোনোমতেই আপনার সঙ্গে দৌড়ে পারি না। কিন্তু একটা বিষয় বরাবর আমাকে অবাক করে!
-সে আবার কী রে …
-না, মানে যখন মরা টাইপের কোনো শেয়াল এসে আমাদের গৃহস্থের মুরগি নিয়ে যায় তখন আপনি শত চেষ্টা করেও ওই মরা শেয়ালটাকে ধরতে পারেন না!
-সেই কথা! শোন, শেয়াল যখন মুরগি নিয়ে পালায় সে দৌড়ায় নিজের জন্যে আর আমি দৌড়াই গৃহস্থের জন্যে! তাই দুর্বল-তবুও তাকে ধরতে পারি না!
গল্পটা শেয়াল ও কুকুরের হলেও আমাদের জীবনেরই যাপিত ছবি। পৃথিবীর সব অধ্যাপক চিকিৎসক প্রকৌশলীই চায় আমার পুত্র আমার মতো হোক। সকল পীর শাইখুল হাদীস ও বরেণ্য মনীষীই চায় আমার পুত্র হোক আমার আদলে প্রতিষ্ঠিত। অথচ বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি এর ব্যতিক্রম চিত্র। কেন? খ্যাতিমান গুণীজন ও প্রতিষ্ঠিতদের মানিক পুত্রগণ দৌড়ায় বাবার জন্যে। আর শূন্য থেকে যারা উঠে আসে তারা দৌড়ায় নিজের জন্যে। সফলতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এদের পায়ে পড়েই চুমু খায়!
জিরো থেকে হিরো এবং শূন্য থেকে তারকা
মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের এ এক ধারাবাহিক সত্য। দুনিয়ার নানা ক্ষেত্রে এর উপমার অভাব নেই। পার্থিব জগতের একটা উপমা দিই। একজন অ্যামাসিও ওর্তেগো। ২০১৪ সালের সারা বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনবানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তিন সন্তানের জনক। বয়স ৭৭ বছর। তার নিট সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। থাকেন স্পেনের লা করুনায়। জন্ম নর্থ স্পেনে। মজার কথা হলো-তার বাবা ছিলেন রেলওয়ের একজন সাধারণ শ্রমিক। তার মা বিভিন্ন বাসায় কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন। পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই আগ্রহী ছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই অর্থের অভাবে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছিল তাকে। ১৯৭২ সালে ওর্তেগো প্রথম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। চালু করেন একটি ফ্যাশন হাউজ। সেখানে শুধু বিভিন্ন ধরনের সার্ট বিক্রি হতো, যা পরবর্তী সময়ে ‘জার’ ব্রান্ড নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। ২০১৩ সালের অক্টোবরের হিসাব মতে জারের সারা বিশ্বে এক হাজার ৭২১টি শো রুম আছে।
[ দৈনিক আমাদের সময়।। ২৮.০৪.১৪] আরেকটি উপমা। আগেরটির চাইতেও উজ্জ্বল। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিশ্বের সবচে’ বড় গণতান্ত্রিক দেশের এই দাপুটে প্রধানমন্ত্রী কোথা থেকে উঠে এসেছেন-নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি। তার ভাষায়-‘আমি স্টেশনে চা বিক্রি করতাম। আমার মা অন্যের বাড়ি বাড়ি থালাবাসন মাজতেন।’ নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের এক জনসভায় তিনি তার অতীতের দুঃখগাথা এভাবেই তুলে ধরেন। তিনি সরল ভাষায় দাবি করে বলেছিলেন-দারিদ্র্যের জ্বালা আমি বুঝি। দেশের পতিত দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্রদের উদ্দেশে বলেছিলেন-আপনাদের দুঃখ কষ্ট আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝবে না। একদা আমি চা বেচতাম। মা অন্যের বাড়িতে বাসন মাজতেন। এভাবেই পেট চলত আমাদের। [আমাদের সময় ।। ২৪.০৪.১৪] দুটো গল্পই প্রেরণার খনি। মা কাজের বুয়া। তার পুত্র বিশ্বের তৃতীয় ধনী। কাজের বুয়ার চা বিক্রেতা পুত্র পৃথিবীর সবচে’ বড় গণতান্ত্রিক দেশের অমিততেজ প্রধানমন্ত্রী! কিসের শক্তিতে! স্বপ্ন প্রতিজ্ঞা এবং স্বপ্ন জয়ের লক্ষ্যে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম। এই সাধনার মধ্যেই মানুষ কল্পনাতীত জয় নিয়ে ঘরে ফিরে! ইতিহাস বলে জিরো থেকে হিরো।!
জ্ঞানের রাজ্যেও আছে এমন অবিশ্বাস্য উপমা। দুটি উদাহরণ দিই!
এক. ইলম ও জ্ঞানের আকাশে সমুজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম আবু ইউসুফ রহ.। মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস। হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর স্বর্ণশিষ্যদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। ইমাম ও হাফেযে হাদীস। বাদশাহ মাহদী, হাদী এবং হারুনুর রশীদের কালের সম্মানিত বিচারপতি। কাযীউল কুযাত-প্রধান বিপারপতি উপাধিতে বিভূষিত প্রথম মনীষী। কাযীউ কুযাতিদ দুনয়া-জগতের প্রধান বিচারপতি বলা হত। ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মাজহাব প্রতিষ্ঠিত তার লেখা মূলনীতির উপর। হাদীস, তাফসীর, মাগাযী এবং আরবইতিহাস ছিল তাঁর নখদর্পণে। [যিরাকলী, আলআ’লাম : ৮: ১৯৩] শুধু অলঙ্কারের বিচারপতি ছিলেন না। ছিলেন স্বর্ণকালের বিচারপতিগণের ছবি। একটি বিচারের কাহিনী তিনি নিজেই বলেছেন। তাঁর ভাষায়-‘একদিন এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলল, তার একটি বাগান আছে। বাগানটি এখন আমীরুল মুমিনীনের দখলে। আমি আমিরুল মুমিনীনের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন-বাগানটি বাদশাহ মাহদী আমার জন্যে কিনে ছিলেন। আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন চাইলে লোকটিকে ডাকি এবং তার বক্তব্য শুনি। লোকটিকে ডাকা হলো। সে যথারীতি বাগানটি তার বলেই দাবি করল। আমি বললাম-আমীরুল মুমিনীন! আপনি কী বলেন? তিনি বললেন : বাগানটি আমার। আমি আগত লোকটিকে বললাম-শুনলে আমীরুল মুমিনীন কী বলেছেন? সে বলল : কসম করে বলুন! আমি বললাম-আপনি কি কসম করবেন-আমীরুল মুমিনীন! বললেন-না। আমি বললাম-দেখুন, আমি আপনাকে তিনবার কসম করার জন্যে প্রস্তাব করব। কসম করলে তো ভালো। নইলে আমি আপনার বিপক্ষে রায় দেব। কথামতো আমি তিনবার প্রস্তাব করি। তিনি কসম থেকে বিরত থাকেন। আমি বাদীর পক্ষে রায় দিই এবং বাগানটি তাকে বুঝিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করি। [আল্লামা ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-মাকতাবাতুস সফা, ১০: ১৪৯] জ্ঞানের উচ্চতায় তাঁর অধিষ্ঠান ছিল কোথায়-সে কথা সকলেরই জানা। যাঁর সান্নিধ্যে থেকে আবু ইউসুফ হয়েছিলেন ‘ইমাম’ আবু ইউসুফ, সেই আবু হানীফার কথা শুনি। একবার ইমাম আবু ইউসুফ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি যুবক। খবর শুনে তাকে দেখতে যান ইমাম আবু হানীফা। তাকে দেখে যখন বের হন তখন বলেন-
ان يمت هذا الفتى فهو اعلم من عليها، وأومأ الى الأرض
এই যুবক যদি মারা যায় তাহলে পৃথিবীর সবচে’ বড় আলেম মারা গেল। [হাফেয যাহাবী, মানাকিবু আবি হানীফা ওয়া সাহিবাইহি-৫৩ পৃ.] ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর আরেক উসতাদ আ’মাশ। তিনি উসতাদ ইমাম আবু হানীফারও। হাদীসশাস্ত্রের ধ্রæবতারা। তার মূল্যায়নটি আরও চমৎকার। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু ইউসুফ নিজেই। বলেছেন-একবার হযরত আ’মাশ আমাকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। আমি তার উত্তর দিলাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন-এই উত্তর তুমি কোথায় পেলে? বললাম-আপনি যে আমাকে একটি হাদীস শুনিয়েছিলেন তার আলোকে। আ’মাশ বললেন-
يا يعقوب! إني لأحفظ هذا الحديث قبل ان يجتمع ابواك، فما عرفت تأويله الا الآن
ইয়াকুব! তোমার মা-বাবা মিলিত হওয়ার আগে থেকেই এই হাদীস আমার মুখস্থ। অথচ এর মর্ম বুঝলাম এই এখন। [ঐ-৫৪ পৃ.] মহান দুই শিক্ষকের এই স্বীকৃতির পর আর কী চাই! তারপরও বলি-এক সময় হাদীসের ছাত্রদের কাছে আকাশের চাঁদ ছিল সনদের উচ্চতা। ইমাম আবু ইউসুফের ঘরে সেই ধনও ছিল। ইমাম আবু হানীফা তাবেঈ। তার হাদীস ও ফেকাহ’র ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ তাবেতাবেঈ। সাধেই কি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন-
اول من كتبت عنه الحديث ابو يوسف
‘আমি সর্বপ্রথম হাদীস লিখেছি ইমাম আবু ইউসুফ থেকে।’ [কাজী আতহার মুবারকপুরী, আইম্মায়ে আরবায়া-১৯০ পৃ.] হাদীসশাস্ত্রের আরেক নক্ষত্র ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন। তার উচ্চতা উপলব্ধির জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট-তিনি বলেছেন :
كتبت بيدي الف الف حديث
আমার এই হাতে দশ লাখ হাদীস লিখেছি।
আর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন-
كل حديث لايعرفه يحى بن معين فليس بحديث
ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন যে হাদীস জানেন না সেটা হাদীসই না। [যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৯:৩৬৪; তাযকিরাতুল হুফফায-২;১৫] এই ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ছাত্র ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফের। ফলেই তো বৃক্ষের পরিচয়। কথা হলো, এই উচ্চতায় কীভাবে অধিষ্ঠিত হলেন ইমাম আবু ইউসুফ। বলেছেন-
صحبت أبا حنيفة سبع عشر سنة لا افارقه في فطر ولا اضحى الا من مرض
আমি সতের বছর ছায়ার মতো আবু হানীফার সঙ্গে থেকেছি! কেবল অসুস্থতা ছাড়া রোযা কিংবা কুরবানীর ঈদেও তার সঙ্গ ছাড়িনি।
কতটা অবিচ্ছিন্নভাবে সঙ্গে থেকেছেন তার একটা অনুপম উপমা দিয়েছেন ইমাম আবু ইউসুফ নিজেই। বলেছেন-
مات ابن لي فلم احضر جهازه ولا دفنه وتركته على جيراني واقربائي مخافة ان يفوتني من ابي حنيفة شيئ لاتذهب حسرته عني
আমার এক পুত্র মারা যায়। আমি তার কাফন-দাফনেও যাইনি। এর ভার আমার প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের ওপর ছেড়ে দিই। সেটা শুধু এই ভয়ে-যদি এই অনুপস্থিতির প্রহরে আবু হানীফার কোনো পাঠ হারিয়ে ফেলি সে দুঃখ আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
[আল্লামা যাহেদ কাওসারী, হুসনুত তাকাযী ফি সীরাতিল ইমাম আবু ইউসুফ আলকাযী, মাকতাবাতুল হাসান-৮১, ৭৬ পৃ.] এই অনন্য সাধনা আর অবধ্য প্রতিজ্ঞায় তিনি তারকা হয়ে উঠেন মহাকালের। তার শূন্য ও সূচনার দিকে একবার তাকাই! তিনি নিজেই বলেছেন-আমার বাবা ছিলেন গরীব। তার একটি ছোট্ট দোকান ছিল। আমার মন ছিল হাদীস ও ফেকায়। একদিন আমি আবু হানীফার দরবারে বসে আছি। আমার বাবা এসে বললেন-বাবা! আবু হানীফার সঙ্গে তুমি পা ছড়িয়ে বসো না। তার ঘরে খাবার প্রস্তুত। তোমাকে তো উপার্জন করতে হবে। আমি আমার বাবার কথা শুনলাম। আবু হানীফা আমাকে খুঁজছেন। আমিও আসব আসব করছি। যখন আসলাম তিনি আমাকে একশ’ দেরহামের একটি থলে দিয়ে বললেন-নিয়মিত ক্লাসে থেকো। এটা শেষ হলে আমাকে বলো। কিছু দিন পর আবার একশ’ দেরহাম দান করেন। তারপর বরাবর আমার খোঁজখবর রাখেন। [যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, তরজমা : ১৩১৩; মানাকিবু আবি হানীফা ওয়া সাহিবাইহি-৫২ পৃ.] বাবা একজন ক্ষুদ্র দোকানী! পুত্র পৃথিবীর প্রধান বিচারপতি এবং শাশ্বত ধর্ম ইসলামের মানিত ইমাম ও জ্ঞানের আকাশে সমুজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রতিষ্ঠা ও সাধনা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়-ভাবা যায়!
আমাদের জ্ঞান ও শাসনের রাজ্যে এমন উপমার অভাব নেই। হাদীসশাস্ত্রের প্রথম সম্রাট হযরত আবু হুরায়রা রাযি. কী ছিলেন! সামান্য ছাগলের রাখাল। এখন তিনি আমাদের ঈমানের ধমনীতে বাহিত রক্তের মতো। হযরত নাফে’। ইবনে ওমর রাযি. এর আজাদকৃত গোলাম। অথচ ইমাম বুখারীর দৃষ্টিতে হাদীসের শ্রেষ্ঠ সনদের মালিক-নাফে আন ইবনে ওমর। এই হাসান বসরী রহ.। হাদীস ফেকাহ ও তাসাউফের ইমাম। অথচ তার মা-বাবা দু’জনই ছিলেন একদা ক্রীতদাস। আলোছড়ানো এই নক্ষত্রদের আলোয় আমরা পথ চলছি হাজার বছর ধরে।
দুই. ভিন্ন প্রাঙ্গনের একটি উপমা দিই! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আমাদের ভাষায় বাহরুল উলূম। বাঙলাভাষী মানুষ ও বাঙলাভাষার বিকাশ ও চর্চার ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক অনন্য নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি হলো-বাঙলাভাষা। তিনি বলেছেন-‘বিদ্যাসাগর বাঙলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন।’ ১৮০০ সালের আগে বাঙলাগদ্য বলতে তেমন কিছু ছিল না বললেই চলে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ১৮০০ সালে বাঙলাগদ্য প্রচলন করে। তার আগে চিঠিপত্রে, দলিলে কিছু কিছু বাঙলাগদ্যের নমুনা পাওয়া যায় বটে, তবে সেগুলো খুব মজবুত ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বিদ্যাসাগর দেখিয়েছেন-বক্তব্য সরল করে এবং সুশৃঙ্খল করে বলতে হয়। এর আগে বাঙলায় অকারণ সমাসবদ্ধ বড় বড় শব্দ ছিল। বিদ্যাসাগর সেগুলো আলাদা আলাদা শব্দে ভাগ করে ব্যবহার করেন। একটা পদের পরে আরেকটা পদ কী নিয়মে ব্যবহার হবে, তাও তিনি দেখিয়ে দেন।
আর এভাবেই ঈশ্বরচন্দ্র হয়ে উঠেন বাঙলাগদ্যের জনক। এই প্রতিষ্ঠা অসাধারণ। কথা হলো, কিংবদন্তীতুল্য এই ঈশ্বরচন্দ্র-কতটা পথ হেঁটে এই উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন-তা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মে সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র। বিত্তহীন এক শর্মা পরিবারে। তার পরিবারের চেহারাটা আমরা এভাবে বুঝতে পারি-তার বাবা ঠাকুরদাস পারিবারিক প্রথা ভেঙে ইংরেজি শিখে চারটে পয়সা রোজগারের আশায় কলকাতা গিয়েছিলেন অল্প বয়সে। আর কলকাতায় তার সম্বল ছিল একটা ভাত খাবার থালা। আরেকটা ঘটি। তা-ই নিয়ে তিনি একদিন বের হলেন পেটের ক্ষুধায়। এগুলো বিক্রি করে কিছু খাবার ব্যবস্থা করা যায় কি না। কিন্তু কেউ তার থালা ঘটি কিনতে রাজি হয়নি। কারণ অপরিচিত লোককে কেউ বিশ্বাস করে না। পাছে এগুলো যদি আবার কোনো চোরাই জিনিস হয় আর কোনো বিপাদ-আপদ ঘটে।
এমনই জীবনমরণ সংগ্রাম করে ঠাকুরদাস যৎসামান্য ইংরেজি শিখে যা কাজ পেলেন তাতে তার আয় মাসে ১০ টাকা। পাঁচ টাকা পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে আর থাকে পাঁচ টাকা। ওই পাঁচ টাকায় ঈশ্বর ভাই দীনবন্ধু ও তার বাবার জীবন কীভাবে চলত-কোনো দিন আহার জোটে, কোনোদিন ঠিকমতো জোটে না। কখনও শুধু ভাত। কখনও শুধুই তরকারি! তাছাড়া ওই আট নয় বছর বয়সে রান্নাবান্নাও করতে হতো ঈশ্বরচন্দ্রের নিজ হাতে। বাবা কাজ করে ফিরতে কখনও রাত একটা বাজত। এসে শুনতেন সংস্কৃতের পড়া। চোখে ঘুম পেলে কিংবা পড়া শেখা না হলে মার খেতে হতো তার বাবার হাতে। এই সময় ঘুম তাড়াবার এক চমৎকার কৌশল আবিষ্কার করে ঈশ্বর। ঘুম আসি আসি করছে অনুভব হলে চোখে প্রদীপের তেল মাখিয়ে নিতেন। এতে চোখ জ্বালা করলেও ঘুম আসত না। ফলে জেগে থেকে পড়া শেখা যায়।
অবিরাম এই সাধনায় ঈশ্বরচন্দ্র নিজেকে নির্মাণ করেন প্রথমে কৃতি ছাত্র হিসাবে। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাঙলা বিভাগের সেরেস্তাদার বা প্রধান পণ্ডিত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
পড়াশোনা ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধে কতটা উচ্চতায় নির্মাণ করেছিলেন গরীব ঘরের এই ঈশ্বর চন্দ্র শর্মা-সর্বজনবিদিত ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিই তার যথেষ্ট সাক্ষী। তারপরও একটা মজার ঘটনা বলি-ঈশ্বরচন্দ্র তখন সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্টান সেক্রেটারি। কী একটা কাজে গিয়েছেন হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষের কাছে। হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ তখন কার সাহেব। কার সাহেবের চেম্বারে যাওয়ার পর তিনি বিদ্যাসাগরকে বসতে বললেন না। তিনি বরং চেয়ারে বসে ছিলেন টেবিলের ওপর জুতাসহ দুই পা তুলে দিয়ে। বিদ্যাসাগর তার কাজ শেষ করে চলে এলেন। কিন্তু অপমানটা তার মনে ঠিকই কাঁটা হয়ে বিঁধে রইল।
কিছুদিন পর কার সাহেবও এলেন বিদ্যাসাগরের অফিসে কী একটা কাজে দেখা করতে। এই তো সুযোগ। বিদ্যাসাগর তার চটিজুতাসহ দুই পা তুলে দিলেন টেবিলের ওপর। তারপর কার সাহেব কেন এসেছেন জানতে চাইলেন এবং জবাব দিলেন।
কার সাহেব এতে খুবই অপমানিত বোধ করলেন। ফিরে গিয়ে বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন সরকারের শিক্ষা পরিষদের সেক্রেটারি ময়েট সাহেবের কাছে। ময়েট সাহেব বিদ্যাসাগরের কাছে কৈফিয়ত তলব করলেন। বিদ্যাসাগর তখন বললেন : আমি ভেবেছিলাম আমরা অসভ্য, সাহেবরা সভ্য। সাহেবদের কাছেই আমাদের সভ্যতা শেখা উচিত। কার সাহেবের কক্ষেও আমি গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন আমি ভেবেছিলাম সেটাই অভ্যর্থনা জানানোর রীতি। তিনি যখন আমার কক্ষে এলেন ঠিক সেভাবেই আমি তাকে অভ্যর্থনা জানাই। এ জন্যে আমার যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে সেজন্যে কার সাহেবই দায়ী।
বিদ্যাসাগরের কথায় ময়েট সাহেব বিষয়টা বুঝতে পারলেন। পরে কার সাহেবকে ডেকে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মীমাংসা করে নিতে বলেন। [আনিসুল হক, বিদ্যাসাগর-বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র] নবী হওয়া যায় না, সাহাবী হওয়া যায় না। তবে স্বপ্নে-প্রতিজ্ঞায় সাধনায় নির্ঘুম-নিমগ্ন হতে পারলে শূন্য থেকে তারকা হওয়া যায়! [চলবে-বিইযনিল্লাহ]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন